পিতামহ

পিতামহ


"পিতামহ" বইটির মূল্য

নতুন বইঃ 560 Taka


"পিতামহ" বইটির বিস্তারিত

পৃষ্ঠা সংখ্যা ৫২৪

৪৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ইয়াসরিবের সবুজ ভূ-খণ্ডে জন্ম নেয় এক বিস্ময়কর আরব শিশু। মাথাভর্তি সাদা চুল দেখে মা তার নাম রাখেন শাইবা। পরিণত বয়সে এই শাইবা হয়ে ওঠেন জাহিলি আরবের কিংবদন্তিতুল্য নেতা আবদুল মোত্তালিব। 'পিতামহ' এই শুভ্রচুলের মক্কানেতা আবদুল মোত্তলিবের জীবনাশ্রিত উপন্যাস।

ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আবদুল মোত্তালিব, তার সময়ের মক্কা স্মরণকালের শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি পাড়ি দিচ্ছিল। নবি-জন্মের পূর্বাভাস, কন্যাশিশু হত্যা, গোত্রীয় দাঙ্গা, কৌলিন্য প্রথা, প্রেম-দ্রোহ, কাব্যযুদ্ধ, দাসব্যবস্থা, লুটতরাজ, হস্তিবাহিনীর কাবা আক্রমণ—গোটা আরব অগ্নিগর্তের কিনারায় অবস্থান করছিল। পিতামহ সেই অগ্নিগর্ভ সময়ের দলিল।

প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বের আরব্য ইতিহাসের টালমাটাল সেই সময়টাকে মনোরম গদ্যে, বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে, শাঁসসমেত তুলে এনেছেন একুশ শতকের বাঙালি কথাশিল্পী সাব্বির জাদিদ।

পাঠক, ইতিহাসের মরুবালিতে পা ডুবিয়ে, এক সংবেদী শিল্পীর জাদুময়ী ভাষায়, আসুন পাঠ করি ষষ্ঠ শতকের অন্ধকারচ্ছন্ন আরবকে এবং আমাদের পিতামহকে।

কখনো তেতে-ওঠা মরুবালুতে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে, কখনো-বা রোদ-ঝলসানো দুপুরে দ্রুতগামী অশ্বের খটখট খুরের আঘাতে বালিঝড় উড়িয়ে ইতিহাস ছুটে গেছে নানান প্রান্তে। ছুটে গেছে সুদূর ইয়েমেনে। আবরাহার চতুরতার ফাঁদে আটকে পড়ে আবার ফিরে এসেছে মক্কার উপকণ্ঠে, এক বেদুইন পল্লিতে।
মনে কি হয়নি যে, এই একটি চরিত্রের হাত ধরেই বারবার ঘুরে গেছে ইতিহাসের বাঁক?

এভাবেই ধীরে ধীরে, জীবনের কাছে হেরে যাওয়া এক দিকভ্রান্ত পথিকের হাত ধরে নানান প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছে জাহেলি আরবের অন্ধকারাচ্ছন্ন ইতিহাস---বিস্তৃত পরিসরের যে ইতিহাসের নির্মম-করুণ-মায়াবী-হৃদয়ছোঁয়া আখ্যানপর্বগুলো এই উপন্যাসে ধারণ করেছেন লেখক সাব্বির জাদিদ। তবে পুরো উপন্যাসের সার্বক্ষণিক কেন্দ্রীয় চরিত্রে থেকেছেন মক্কার সর্বজন শ্রদ্ধেয় নগরপিতা আব্দুল মোত্তালিব।

এর মধ্যে মরুভূমির বালির ভেতর মেয়েদের জীবন্ত পুঁতে ফেলা, তালহার ক্রীতদাস হয়ে ওঠার নির্মম গল্প, অবলম্বনহীন একটি পরিবারের নিদারুণ অসহায়ত্ব, স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে আবদুল মোত্তালিব কর্তৃক জমজম আবিষ্কারের পর কোরাইশ নেতাদের ক্ষমতা-দখলের নগ্ন লালসা, গোত্রীয় দাঙ্গা, ক্রীতদাসের সাথে মালিকের মেয়ের এক অদ্ভুত সুন্দর অসম প্রেম, হত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ-- সব মিলিয়ে কত কত লোমহর্ষক গল্পের পাণ্ডুলিপি জমিয়ে ফেলেছে পৃথিবী নামক এই গ্রহ।

'যে জীবন ফরিঙের' পর্বটা পড়তে পড়তে দেখি নিজের অজান্তেই চোখদুটো ভিজে উঠেছে। যুবক কায়েস, আবদুল মোত্তালিব যাকে দাসের হাট থেকে কিনে এনেছিলেন, আজাদ হওয়ার পর পৃথিবীতে তার কেউ নেই বলে মুক্তির আনন্দ-সংবাদ জানানোর জন্য চাঁদ-ওঠা এক রাতে বন্ধু তালহার বাড়ির সামনে গিয়ে বসে থাকে। তালহাদের দরজার কড়া নাড়বে-কি-নাড়বে না, এক ধরনের দ্বিধা-জড়তা-সংকোচ ওকে ঘিরে ধরে।এই মধ্যরাতে ঘুম ভাঙিয়ে দিলে ওরা আবার বিরক্ত হবে না তো! পরক্ষণে ভাবে, আমার মুক্তির সংবাদে এদের কী এসে যায়!
আহ, ফরিঙের ঠোঁটে বয়ে বেড়ানো কী এক নির্মম জীবন!

'কুমারিত্বের পরীক্ষা' পর্বটা পড়ে খুব হাসি পেয়েছে।যুগপৎভাবে খারাপও লেগেছে খুব । হায় রে অন্ধকারাচ্ছন্ন জাহেলিয়াত।

দুই.

বহুবছর ধরে এত এত সংঘাত, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ আর দাঙ্গা-হাঙ্গামা বয়ে যাওয়ার পর জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণায় ভরে ওঠে পোড়-খাওয়া তালহার মন। এইসব নষ্ট দিনের জন্য সে আর বাঁচতে চায় না। আলোকিত এক নতুন পৃথিবীর জন্য
তালহার মন বড় আকুপাকু করে ওঠে। সে অপেক্ষায় থাকে একজন মহাপুরুষের, যিনি এসে এই অস্থির পৃথিবীর চাকা ঘুরিয়ে দেবেন ভিন্নদিকে, শান্তির সুশীতল ছায়ায় হবে মানুষের আশ্রয়।

সে তাই হাত থেকে একদিন তলোয়ারটা ছুড়ে ফেলে দেয়।লেখক লিখেছেন, 'তালহা
বহুদিনের সাক্ষী তলোয়ারটা ছুড়ে মারল ঝরনার পানির ভেতর। ঝপাৎ করে একটা শব্দ হলো। তারপর হারিয়ে গেল পানির তলদেশে। তলোয়ারটা বহুমানুষের রক্ত ঝরিয়েছে। আজ ওকে ডুবে যেতে দেখে প্রশান্তি লাগল তালহার। আর কোনোদিন অস্ত্র ধরব না-- মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল ও। অচিরেই ও এমন জায়গায় চলে যাবে, যেখানে রক্তপাত হয় না। আসলেই কি আছে তেমন কোনো পৃথিবী?

উপন্যাসের শেষের দিকে এত-এত চমক অপেক্ষা করিছল, কে জানত। আহ, হামামা! আবরাহার ভাতিজি সেই অবলা হামামা! কাবাঘর ভাঙতে এসে আসমানি পাখিদের দ্বারা আবরাহার বাহিনির ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর হামামাকে নিয়ে কী এক করুণ দৃশ্যের অবতারণা হলো। পড়তে পড়তে বারবার বুক মুচড়ে উঠেছে। চোখ ভেঙে গলগল করে বেরিয়ে এসেছে উষ্ণ জলের ধারা।

তারপর যে এক চাঁদ-রাতের আবছা আলোয় মরুর ঠাণ্ডা বালির বুকে মন মুচড়ে-দেয়া আরো একটি চমক বসে থাকবে, আমার পাঠক-মনের অভ্যন্তরে এর জন্য কি আগে থেকেই খুব গোপনে লুকিয়ে থাকা একটি প্রতীক্ষা ছিল না ? হয়তো..!

পুরো উপন্যাসটাই ছিল হাজার বছর আগের ইতিহাসের অলিতেগলিতে ছুটে বেড়ানো এক সুদীর্ঘ জার্নি।কিছু কিছু দৃশ্যপটে চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারিনি। দাঙ্গা-হাঙ্গামার সেই ভয়ংকর ময়দানগুলো কী যে রুদ্ধশ্বাসে পাড়ি দিতে হয়েছে!

শেষমেশ সেই প্রতীক্ষিত মহামানবের আগমনের সময়ে এসে লেখক এই আখ্যানের ইতি টেনেছেন। সেখানে তিনি পাঠক-মনের কৌতূহল আরো চাঙা করে তুলেছেন। সারাজীবন একটুখানি সুখের ছায়া খুঁজে বেড়ানো পোড়-খাওয়া এই তালহা
কি সেই শান্তিদূতের পরম নির্ভরতার হাতে নিজের হাতটা রাখতে পেরেছিল?

পড়তে বসে বারবার মনে হয়েছে, এক দারুণ অ্যাডভেঞ্চার কিংবা ফ্যান্টাসির জগতে ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছি। না, জাদুবাস্তবতা নয়, বাস্তবতার জাদুই ছিল সেখানে এতোটা প্রবল।

তিন.

ইতিহাসের বর্ণনাকারীগণ সাধারণত দুই শ্রেণির হয়ে থাকেন। এক, ধারাবাহিকভাবে শুধু ইতিহাসটাই বলে যান। দ্বিতীয় শ্রেণির ইতিহাসবেত্তাগণ ইতিহাস বর্ণনার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া ঘটনাপরম্পরাকে একসাথে মিলিয়ে ফলাফল বের করেন।
সাব্বির জাদিদ যদিও ইতিহাস আশ্রয় করে উপন্যাসই লিখেছেন, তবু কেন জানি মনে হয়েছে, মাঝেমাঝে তিনি দ্বিতীয় শ্রেণির এই কাজটি খুব সূক্ষ্মভাবে করেছেন।

সাব্বির জাদিদের কথক ভঙ্গিটি অসাধারণ। চমৎকার তার চরিত্র-চিত্রণ আর নির্মাণ-কৌশল। গল্পের প্রথম পঙক্তিতেই পাঠককে মনোযোগী করে তোলার এক জাদুময়ী ক্ষমতা আছে তাঁর। তিনি খুব নিটোল-কোমল-মুচমুচে শব্দগুচ্ছ দ্বারা গড়ে তোলেন বাক্যের দৃষ্টিনন্দন সব প্রাসাদ। উদাহরণ দেয়া যাক, পিতামহ থেকে উদ্ধৃত করছি, 'বর্শার আঘাতে তার কপাল, ভ্রু, নাকের মাঝখানে লম্বালম্বি এক ক্ষতের সৃষ্টি হলো। ছাগলের পেটের চামড়া ছাড়ানোর সময় ছুরির আগা দিয়ে একটুখানি কেটে দুপাশে টান দিলে চামড়া যেভাবে দুইভাগ হয়ে যায়, আবরাহার মুখের চামড়াও দুইভাগ হয়ে দুইপাশে সরে গেল। অবশ্য রক্তের স্রোতে মুখমণ্ডলের পরিবর্তিত এই মানচিত্র তৎক্ষণাৎ দৃশ্যমান হলো না'। 'তালহার কল্পনার সুতো ছিঁড়ে যায় কারো পদশব্দে।'

উপর্যুক্ত বাক্যগুলো থেকেই টের পাওয়া যায় সাব্বির জাদিদের সূক্ষ্ম-নিখুঁত বাক্যের বুনন।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে। যুগে যুগে পৃথিবী নামক এই গ্রহটির ভেতর পূর্ব-যুগের ইতিহাসের সেই একইরকম বিষয়াবলির পুনরাবৃত্তির ঘটে চলেছে।
0