আমাদের ইন্তিফাদা

আমাদের ইন্তিফাদা's Category :

আমাদের ইন্তিফাদা's Publication :

আমাদের ইন্তিফাদা's Writer :

আমাদের ইন্তিফাদা


"আমাদের ইন্তিফাদা" বইটির মূল্য

নতুন বইঃ 24 Taka


"আমাদের ইন্তিফাদা" বইটির বিস্তারিত

মুদ্রিত মূল্য: ৪০ টাকা

অনেক বই আছে যা ইতিহাস গ্রন্থ না হয়েও একটা সময় ইতিহাসের উপাদানরূপে বিবেচিত হয়। সময়ের স্রোতে ভেসে যখন বর্তমানের ঘটনাপঞ্জি হারিয়ে যায় কালের গর্ভে, তখন সেই বই দূরাগত প্রজন্মের সামনে তুলে ধরে ধুসর হওয়া অতীতের চিত্রাবলী। ইতিহাসের অন্যতম ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় সেই বই। এই জাতীয় বইগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

তরুণ লেখক আতিক উল্লাহ রচিত "আমাদের ইন্তিফাদা" এই ধরনেরই একটি বই। এই বইটিতে হেফাজত-বিপর্যয় পরবর্তী বাঙলাদেশের উলামায়ে কেরামের সামাজিক সংকট ও বিপদসঙ্কুল অবস্থা অল্প পরিসরে অত্যন্ত সুনিপুণরূপে চিত্রায়ন করা হয়েছে। তুলে ধরা হয়েছে বিপর্যস্ত মানবতার করুণ রূপ।
বইটিতে লেখক তার কল্পনা বা ধারণার আশ্রয় না নিয়ে চোখে দেখা ঘটনাগুলো তুলে ধরেছেন। কিছু তার নিজের সাথে ঘটা। কিছু তার সামনে অন্য কারো সাথে ঘটা। কিছু আছে যা তিনি তার কাছ থেকে শুনে লিখেছেন যার সাথে ঘটনাটি ঘটেছে বা সেই ব্যক্তি নিজে দেখে তার কাছে বর্ণনা করেছেন। ফলে পুরো বইটি বিশ্বস্ততার চাদরে মোড়ানো বলা যায়। ঐতিহাসিক দলিলের ক্ষেত্রে যা অতিব জরুরি।

শাপলা-ট্র্যাজেডিতে আহতদের সেবাশুশ্রূষা আর নিহতদের পরিবারের খোঁজ নিতে বাঙলাদেশের নানা প্রান্তে লেখক একাধিক সফর করেছেন। অনেক হাসপাতাল আর এখানে সেখানে ছুটোছুটি করেছেন। সেই সফরগুলো আর ছুটোছুটির কারগুজারিই এই বইয়ের মূল প্রতিপাদ্য। সেই সাথে প্রসঙ্গক্রমে কথায় কথায় উঠে এসেছে শাপলা-ট্র্যাজেডি পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অন্যান্য বিষয়আসয়।

বইটা শুরু করে পাঠক প্রথম পৃষ্ঠা পাড়ি দিয়ে দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় যেতেই বড়সড় একটা ধাক্কা খাবেন। হয়ত তার অজান্তেই চোখের পাপড়ি দু'টো অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠবে। তার মনে একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খেতে থাকবে, 'মানুষের প্রতি মানুষ এমন হৃদয়হীন-বর্বর হতে পারে! এ-ও কি সম্ভব!' প্রিয় পাঠক, সেখান থেকে অল্প ক' লাইন তুলে ধরার লোভ সামলাতে পারছি না।
"ছেলেটার পা না কাটলেও হতো। কিন্তু ডাক্তার অপারেশনে না গিয়ে, একপ্রকার জোর করেই পা-টা একদম গোড়া থেকেই কেটে ফেলেছে। এখানেই শেষ নয়, এক ডাক্তার অসহায় ছেলেটার পা ড্রেসিং করতে এসে পায়ের কাটা স্থানে কেঁচির খোঁচা দিয়ে প্রায়ই বলতো: কেন গিয়েছিলি? আর যাবি হেফাজতে?"
এভাবেই লেখক একে একে অজানা অনেক কথাই পাঠককে জানাবেন। পুরো বই জুড়েই এমনসব কলজে কাঁটা দেওয়া ঘটনার ছড়াছড়ি। গুমোটবাঁধা আবহাওয়ার সেই দিনগুলিতে সরকারি হাসপাতালগুলো 'হেফাজতি' হবার অপরাধে নবিপ্রেমিকদের সাথে কেমনসব আচরণ করেছে তার ছোটখাট দৃশ্যায়ন রয়েছে পরবর্তী কয়েকপাতা জুড়ে।

সবচে প্রশংসার কথা হল, ছোট্ট এই বইটিতে লেখক অনেকগুলো বিষয়ের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। সেখানে কথার ফাঁকে ফাঁকে তিনি কোথাও গুরুত্বপূর্ণ জীবন-দর্শন তুলে ধরেছেন, কোথাও উপমাকেন্দ্রিক উপদেশ দিয়েছেন, কোথাও আবার পাঠককে বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য করেছেন। অনেক জায়গায় আত্মউপলব্ধি আর ভাবনার খোরাক জুগিয়েছেন।

এসব কিছু ছাপিয়ে যে জিনিসটি আমার কাছে সবচে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে; আগামী ইতিহাস রচনাতেও যা আলোক-মশাল হিসেবে কাজ করবে, তা হল, শাপলা-ট্র্যাজেডিতে নবিপ্রেমিকদের রক্ত নিয়ে অনেকে উপহাস করেছেন। রং মেখে শুয়ে থাকার মতো অপবাদ দিয়েছেন। নিহত হবার খবরকে বানোয়াট বলেছেন। তাদের এসব অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বইটি একটি বলিষ্ঠ দলিল হতে পারে।

'এক অব্যক্ত বেদনার আখ্যান' শিরোনামে যে কাহিনী লেখক বিবৃত করেছেন তা আমি চেষ্টা করেও পুরো পড়তে পারি নি। আমার দুর্বল চিত্ত এর ভার বহনে অক্ষম ছিল। ঘটনার মাঝপথে এসে আমি পরাজিত হই। আমাকে এক পৃষ্ঠা বাদ দিয়ে সামনে এগুতে হয়। মনুষত্বহীন মানুষকে কেন পশুর চেয়েও অধম বলা হয়েছে কুরআনে, সেটা আমি খুব উপলব্ধি করেছি এখানে এসে।

'মানুষ মানুষের জন্য' কথাটা আমরা মুখে মুখে আওড়ালেও বাস্তবে আমরা মানব সেবা থেকে অনেক দূরে সরে আছি। বইটা পড়ার পর এই ভাবনাটা হৃদয়ের গভীরে অবশ্যই জাগ্রত হবে। সেই সাথে কিছু মানুষের নিজের সময়-শ্রম আর দিন-রাত একাকার করে মানব সেবায় ছুটে চলার দাস্তান পড়ে তাদের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আর সম্মান তৈরি হবে। বিশেষ করে মাওলানা রজীবুল হক সাহেবের প্রতি অন্যরকম একটা মানবিক দুর্বলতা তৈরি হতে বাধ্য। যিনি অহর্নিশি মানব সেবার কাজে ছুটে চলছেন দূরন্ত গতিতে।

লেখকের নিজের সাথে ঘটা ঘটনাগুলোও কম চমকপ্রদ না। একটি রাজনৈতিক দলের ক্যাডারদের হুমকি-ধমকি, অসদাচার, তাঁকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়া করানো এবং সেসব থেকে আল্লাহর অপার করুণায় তার উতরে যাওয়া, তাঁর মাদরাসার ছাত্রদের গায়ে হাত তোলা আর একজন শিক্ষককে চপেটাঘাত করা দুই ব্যক্তির করুণ পরিণতির সম্মুখীন হওয়া-- এসব পড়তে পড়তে কখনও পাঠকের হৃদকম্পন বেড়ে যাবে, কখনও কমে যাবে। কোথাও রাগে তার চেহারা লাল হবে কোথাও লজ্জায় মাথা নিচু হবে। এমন রং-বেরঙের অনুভব-অনুভূতি তরঙ্গে দুলতে দুলতেই একটা সময়ে দেখা যাবে বইটির শেষ লাইনে তিনি চলে এসেছেন।

এক কথায় বলতে গেলে বইটি অসাধারণ এবং পড়ার মতো একটি বই। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, প্রত্যেকের সংগ্রহেই বইটি থাকা উচিত। যাতে করে আগামী প্রজন্মের কাছে তারা সচ্ছ-সঠিক ও প্রকৃত ইতিহাস তুলে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে পারেন। অন্যথায় আমাদের অতীতের অনেক বিষয়ের মতো এটিও বিকৃত হয়ে অনাগতদের সামনে উপস্থাপিত হবে। আর এর পরিণতি যে শুভ হবে না তা তো বলাই বাহুল্য।
0