শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.

শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.'s Category :

শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.'s Publication :

শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.'s Writer :

শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.


"শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ." বইটির মূল্য

নতুন বইঃ 288 Taka


"শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ." বইটির বিস্তারিত

মুদ্রিত মূল্যঃ ৫৪০৳

রিভিউ লেখকঃ @সদরুল আমিন সাকিব

মুসলিম জাতির ইতিহাসচর্চা নিছক ঐতিহাসিক জ্ঞানবিলাস নয়, বরং এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইতিহাস সৃষ্টিকারী আল্লাহওয়ালা বীরদের জীবনী থেকে নিজের জীবন ও সমাজের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করা। ধুলোর আস্তর ঝেড়ে প্রকৃত ইতিহাসের আলোকে আত্মপরিচয় পাওয়া আর আত্মোপলব্ধি জাগ্রত করার মাধ্যমেই সেই ইতিহাসচর্চা সফল হতে পারে। ন্যায়নিষ্ঠ ইতিহাসকে সামনে রেখে জাতির নবনির্মাণে অংশ নেওয়া এবং উচ্ছিষ্টের ব্যাপারে নিজে আর আগামী প্রজন্মকে সতর্ক করা মুসলিম সমাজের নৈতিক দায়িত্বও বটে। এতেই তাদের জাতি ও জাতীয়তা রক্ষা পাবে এবং নির্মল এক পৃথিবী গড়ে ওঠবে।
আমাদেরকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে নিকট অতীতের ইতিহাস ও তার প্রভাবের ব্যাপারে। কেননা অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণের প্রকৃত উদ্দেশ্য বর্তমানকে নিষ্কলুষ ও নির্ঝঞ্ঝাটভাবে গড়ে তোলা। আর নিকট অতীতের ইতিহাস অনেক সময় জাতির বর্তমানকে চালিত ও প্রভাবিত করে থাকে। তাই তার উপকারী উপাদানগুলোকে চিহ্নিতকরণ এবং অপকারীগুলোর ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যথায় জাতির পতন কখনই প্রকৃত উত্থানের ঝাঁপটা প্রত্যক্ষ করতে পারবে না।
.
আমাদের সামনে থাকা বইটি দু’টো বিষয়কেই অন্তর্ভুক্ত করেছে; অর্থাৎ নিকট অতীত নিয়ে আলোচনা এবং মুসলিম ইতিহাসের এক বীরের ইতিবৃত্ত নিয়ে গবেষণাসমৃদ্ধ আলোচনা অন্তর্ভূক্ত রয়েছে এতে। গ্রন্থটির রচয়িতা মাওলানা ড. মুশতাক আহমদ। এটি তার পিএইচডি থিসিস।
সায়্যিদ হুসাইন আহমাদ মাদানি –রাহিমাহুল্লাহ- ছিলেন একাধারে বিনয়ী সুফিসাধক, ইলমের ঝাণ্ডাবাহী, সমাজ কল্যাণের অগ্রনায়ক এবং বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন তার সময়ের শ্রেষ্ঠ বুজুর্গদের দ্বারা অনুসরণীয় হওয়ার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এবং সমসাময়িকদের প্রশংসা দ্বারা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন। নিজে যুহদের কুটিরে বাস করেও উম্মাহর জন্য সুখপ্রাসাদ রচনার ফিকিরে ব্যগ্র ছিলেন। উম্মাহর কল্যাণকে সামনে রেখে পাঠদান ও আধ্যাত্মিকতার দীক্ষা প্রদান থেকে শুরু করে কঠিন জগতের সংগ্রাম-আন্দোলন, জেল-জুলুম-নির্বাসন সকলকিছুতেই রয়েছে তার অংশগ্রহণ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে ভারতবর্ষকে মুক্তির সংগ্রামের শেষ পর্যায়ের প্রধান সংগ্রামীদের কাতারে তিনিও বিশেষ একজন। তাকে প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় খেতাব পাওয়া ছিল তার স্বাভাবিক পাওনা, যদিও তিনি ইখলাস ও যুহদের খাতিরে সেটিকে গ্রহণ করেননি। তিনি যদিও তার রাজনৈতিক নিজস্ব বোধ ও দর্শনের দরুন কংগ্রেসের সঙ্গে মিলে জমিয়তের উলামায়ে হিন্দের পক্ষ থেকে কাজ করেছেন এবং মিশ্রজাতীয়তার পক্ষাবলম্বন করেছেন, কিন্তু তার অন্তর ছিল অবশ্যই জাতির দরদে ব্যথিত, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অন্যদিকে এই কঠোর ময়দানের বিপরীতপৃষ্ঠে অবস্থান করে দেওবন্দ মাদরাসার প্রধান শিক্ষকতার দায়িত্বও পালন করে গেছেন দীর্ঘ ৩১ বছর।
.
সারনির্যাস বিবেচনায় গ্রন্থটিকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করা যায়। এক, শায়খ মাদানির জীবনী; দুই, শায়খের চিন্তাচেতনা বিশ্লেষণ; তিন, ভারতবর্ষের ইতিহাস ও তার পর্যালোচনা।
লেখক গ্রন্থটিকে মোট পাঁচটি অধ্যায়ে বিভিক্ত করেছেন। প্রত্যেক অধ্যায়ের ভেতরে আছে প্রাসঙ্গিক পরিচ্ছেদ ও নাম্বার অনুক্রমে অনুচ্ছেদ। তার গ্রন্থবিন্যাস ও তাতে থাকা আলোচনাগুলো নিচে আলোচিত হল।
.
প্রথম অধ্যায়, ‘সমকালীন পরিস্থিতি ও সংগ্রাম-সূত্র’।
এখানে তিনি ইংরেজপূর্ব-ভারবর্ষের ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অবস্থার বর্ণনা, অতঃপর ইংরেজ আমলে ভারতবাসীর উপর নিপীড়ন আর সামাজিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসন এবং তা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ভারতকে যুদ্ধকবলিত এলাকা ফতওয়া প্রদান ও মুজাহিদ আলেমগণের অনবরত চলা সংঘর্ষ-সংগ্রাম; যেমন ওয়াহাবি আন্দোলন, ৫৭-এর মহাবিদ্রোহ, দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট, এভাবে এগিয়ে গিয়ে গ্রন্থের মূল আলোচ্য শাইখুল ইসলাম মাদানির জীবন ও সংগ্রাম শুরুর নিকটে গিয়ে ইতিহাস ও জীবনীর মাঝে যোগসূত্র স্থাপন করে অধ্যায়ের ইতি টানা হয়েছে।
.
বৃটিশপূর্ব ও পরবর্তী ভারত সম্বন্ধে জানার জন্য এই অধ্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ। এই অধ্যায়ে পাওয়া যাবে ভারতে মানবজাতির বসবাস শুরু ও তার আদিবাসীর ইতিহাস, মুসলিমদের আগমন এবং বিভিন্ন উদ্ধৃতিতে উল্লিখিত তাদের উন্নত শাসননীতির বিবরণ।
১৬০০ শতাব্দীতে ২১৮ জন ইংরেজ বণিক ভারতে আগমন করে এবং এদের প্রজন্মান্তরের কূট-ধারাবাহিকতায় কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। বৃটিশরা ভারতীয় মুসলমানদেরকে পঙ্গু করে দিতে চরম আকারের ভূমিকা রাখে। শিক্ষার পতন, অর্থনীতির ভাঙন, নাগরিকদের প্রতি লাঞ্ছিতের আচরণ ইত্যাদি ভারতবাসীর উপর নেমে আসে প্রভুর আজাব হয়ে। ধনাঢ্য মুসলিম ভারতবাসী পথের ফকিরে পরিণত হয়। একসময় দখল হয়ে যায় দিল্লির মসনদসহ পুরো ভারত। ভারতবর্ষের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার দরুন রাস্তা নির্ঝঞ্ঝাট করতে ব্রিটিশের শকুনদৃষ্টি পড়ে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর উপরেও, যেগুলো ভারত আগমনের পথে পড়ে। সবকিছুর ফলেই ক্রমেক্রমে জেগে ওঠে বিদ্রোহ, কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্নরকম। অতঃপর বিদ্রোহী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় দেওবন্দ প্রতিষ্ঠান আর তার থেকে সৃষ্টি হয় শতশত স্বাধীনতাকামী বীরপুরুষ এবং হুসাইন আহমদ মাদানি। ভূমিকাটি আলোচিত হয়েছে ১২৭ পৃষ্ঠাব্যাপী।
.
দ্বিতীয় অধ্যায়, ‘জীবনবৃত্তান্ত’।
এখানে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তার জন্ম-বংশ থেকে নিয়ে পড়াশোনা, আধ্যাত্মিক দীক্ষা, মদিনায় গমন ও সেখানকার জীবনাল্লেখ্য, শিক্ষকতা জীবন, আন্দোলনে জড়ানোর ইতিবৃত্ত, মাল্টার নির্বাসন, প্রত্যাবর্তন ও রাজনীতিতে জড়ানো, সিলেটের শিক্ষকতা, দেওবন্দে শিক্ষাসচিবের পদগ্রহণ, কারাজীবন, স্বাধীনতার দুর্বার আন্দোলন, অন্যান্য রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তার তুলনামূলক বিশ্লেষণ ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এখানে তার জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে সামগ্রিকভাবে ভারতস্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস এসে গেছে, তাই বেশ তৃপ্তির সঙ্গে পড়ার অধ্যায় এটি। পরবর্তী অধ্যায়গুলোকে মূলত এই অধ্যায়েরই পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ ধরা যায়।
.
তৃতীয় অধায়, ‘রাজনৈতিক চিন্তাধারা’।
এই অধ্যায়ে রাজনীতিতে তার দর্শন, কংগ্রেস সমর্থনের কারণ, বিদেশি পণ্য বর্জনের নীতি, অবিভক্ত জাতীয়তার যুক্তি ও পাকিস্তান বিরোধিতার কারণ, স্বাধীনতার পর ভারতীয় মুসলমানদের জন্য চেষ্টাপ্রচেষ্টা ইত্যাদি নিয়ে সুক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
.
চতুর্থ অধ্যায়, ‘শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান।‘
এখানে তার শিক্ষাদর্শন, শিক্ষকতায় পারদর্শিতা ও বৈশিষ্ট্যাবলী, সংস্কার ও সম্প্রসারণ, শিশুশিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষা সম্পর্কীয় দৃষ্টিভঙ্গি, নানুতুবি শিক্ষাদর্শন, দারুল উলুমের অষ্টমূলনীতি, ভারতীয় মুসলমানদের শিক্ষার ব্যাপারে দেওবন্দ ও আলিগড় কলেজের চিন্তাধারা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা এসেছে।
.
পঞ্চম অধ্যায়, ‘আধ্যাত্মিকতা।‘
এতে তার আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, আখলাক, ইবাদত, তাকওয়া অবলম্বন ও সুন্নতের অনুসরণ, সুফিবাদ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি, ইসলাহ ও তারবিয়্যাতের নীতি, ইজাযত ও খেলাফত প্রদান, খলিফাদের নির্ঘণ্ট, কাশফ, কারামত, বিভিন্ন ঘটনা, মানবিক গুণাবলীর সূক্ষ্ম পর্যালোচনা ইত্যাদির আলোচনা এসেছে।
.
অবশেষে উপসংহার টেনে গবেষণা থেকে সৃষ্ট লেখকের ব্যক্তিগত অনুভূতি-অভিমত দিয়ে গ্রন্থের ইতি টানা হয়েছে। শেষে গ্রন্থপঞ্জিকা রয়েছে। সেখানে মূল্যবান অনেক বইয়ের নাম এসেছে, যেগুলো সংরক্ষণ করে রাখা প্রয়োজন। থিসিস হওয়াই প্রচুর উদ্ধৃতি এসেছে।
.
আমার কথা।
সামগ্রিকভাবে বইটি বেশ তথ্যসমৃদ্ধ ও উপকারী। শায়খ মাদানিকে নিয়ে বাংলা ভাষায় সম্ভবত এমন কাজ আর হয়নি। তাই তাকে জানার ক্ষেত্রে একজন বাঙ্গালীর জন্য এটির শরণাপন্ন হওয়া আবশ্যক। এছাড়াও প্রাসঙ্গিকভাবে এতে এসেছে উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস, তাই সেই ইতিহাস জানতে আগ্রহী ব্যক্তির জন্যও এটির উপকারিতা অনস্বীকার্য। পাশাপাশি এখানে আলোচিত আধ্যাত্মিকতা নিয়ে অধ্যায়টিও বেশ মনোযোগ নিয়ে পড়েছি। সুফিবাদের স্বচ্ছধারা বুঝতে এটি বেশ সহায়ক হবে। রচয়িতা যেহেতু নিজেও এই ধারার সাথে সম্পৃক্ত, সেই হিসেবে আলোচনার গভীরতা ফুটে উঠেছে সম্ভবত আরও বেশি।
.
রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে লেখক শাইখুল ইসলাম মাদানির অনুরূপ মিশ্রজাতীয়তার পক্ষপাতী, তাই তার আলোচনা ও প্রমাণকরণ সেদিকেই গেছে। বিভিন্ন সময় তিনি তার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন। এই বইটি হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানত আমার নজর ছিল, মিশ্রজাতীয়তার ক্ষেত্রে শাইখুল ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থান কেমন ছিল, তা বুঝা। ব্যক্তিগতভাবে আমি অবশ্যই দ্বিজাতিতত্ত্বের পক্ষে, তবে শাইখুল ইসলামের প্রতি ভক্তি ও আদবে কোনও প্রকার কমতির বিপক্ষে। তারা তো আমাদের পিতা।
.
দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে চারদিককেন্দ্রিক আলোচনার জন্য গবেষক ব্যক্তির লিখিত বড় গ্রন্থের প্রয়োজন। তবে ছোট করে বললে, মিশ্রজাতীয়তার ক্ষেত্রে প্রথমত প্রধান একটি দৃষ্টিকোণ ছিল ঐক্যবদ্ধতার জোর অর্জন। কেননা ব্রিটিশকর্তৃক ‘ডিভাইড এন্ড রুল’-এর নীতি অবলম্বনের মূল কারণই ছিল দুর্বলতা সৃষ্টি আর তাকে কাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্যবাদি শাসন দীর্ঘায়িত করা।
দ্বিতীয়ত, মিশ্রজাতীয়তার উপর স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে ‘মাদানি ফর্মুলা’-এর প্রস্তাব ছিল, মুসলিম প্রদেশগুলোতে মুসলিম প্রতিনিধি দ্বারা স্বায়ত্বশাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং বিধানসভা, বা মূলকেন্দ্র উভয় গোষ্ঠীর লোক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া। অর্থাৎ দেশ হিসেবে মিশ্রজাতীয়তা মেনে নেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন, তবে ধর্মের ক্ষেত্রে পার্থক্যের মনোভাবই পোষণ করতেন। অবশ্য এক্ষেত্রে আমরা আশরাফ আলি থানবি, মাওলানা শাব্বির আহমদ উসমানি, মুফতি শফি, জফর আহমদ থানবি –রাহিমাহুমুল্লাহ-এর পক্ষাবলম্বন করি।
.
দ্বিজাতিতত্ত্বের শুদ্ধি-অশুদ্ধি নিয়ে ভাবতে হবে আসলে আমাদেরকে প্রধানত ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে। শুধুই রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ দ্বারা ভাবতে গেলে প্রকৃত বিষয়ে পৌঁছতে ব্যত্যয় ঘটবে। ইসলাম যদি কেবল ব্যক্তিজীবনকেন্দ্রিক ধর্ম হতো, তবে মিশ্রজাতীয়তার পক্ষ নেওয়া সম্ভব ছিল; কিন্তু তা তো ব্যক্তি ও সমাজ উভয়জীবনের ধর্ম। সুতরাং মুশরিকদের সঙ্গে শাসনক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেওয়া আদৌ আমাদেরকে ইমানি সমাজ গঠন ও ইসলামি আইন প্রবর্তনের অনুমতি দিত কি, না, তা প্রত্যেকটি মুমিনেরই ভাবা প্রয়োজন। নিশ্চয় ইসলামি রাষ্ট্রের একটি মূখ্য উদ্দেশ্য হয় হচ্ছে, শিরককে ধ্বংস করা, কমপক্ষে তাকে তাওহিদের বাণীর সামনে করজোড়ের সহিত অবনত করে রাখা; এটাকে কি কেউ অস্বীকার করতে পারে? কিন্তু মুশরিকদের সঙ্গে ভাগাভাগি-ক্ষমতার দেশে সেই নীতি বাস্তবায়নের প্রতি বৃদ্ধা আঙ্গুল প্রদর্শন হয় না কি?
.
এটি তো গেল নেহাৎই ইসলামি ভাবনার আলোকে। দ্বিতীয়ত থাকে বাস্তবতা। আমি বিশ্বাস করি, তাওহিদ আর শিরকের সম্পর্ক চিরদিন সেটিই থাকবে, যেভাবে রেখা টেনে গেছেন হজরত ইবরাহিম –আলাইহিস সালাম-। তিনি তো শিরক ও ইমানের বন্ধুত্বের একমাত্র পন্থা বর্ণনা করেছেন ইমানকে গ্রহণ করে নেওয়া...। মিল্লাতে হানিফের অনুসরণের দাবি নিয়ে আমরা কি একথা বলতে পারি যে তার ঘোষিত সেই নীতি নির্দিষ্ট কোনও কালের সাথে সীমাবদ্ধ ছিল?
অতএব, ভারত বিভাগের প্রেক্ষাপটে দ্বিজাতিতত্ত্ব শুরু হওয়ার পেছনে আমি সেই বাস্তবতাও উপলব্ধি করেছি। দ্বিতাতিতত্ত্ব প্রকাশ হওয়ার পেছনে যা দেখতে পেয়েছি, তা হলো ‘নেহেরু রিপোর্ট’-এর প্রভাব। নমনীয়ভাবে বলতে গেলে, ভারতীয় হিন্দুদের মধ্যে ইতোমধ্যে বিদ্বেষের আগুন লেগে গিয়েছিল, (যদিও শিরক মানেই ইমানের বিরুদ্ধে আগুণ লেগে যাওয়া), তা ব্রিটিশ ইন্ধনেই হোক, বা প্রাকৃতিকভাবে...। লেখক মিশ্রজাতীয়তার পক্ষে হওয়াসত্ত্বেও গ্রন্থের কয়েক জায়গায়ই মুসলমান ও তাদের স্বার্থ উপেক্ষা করার বিষয়টি বিদ্যমান ছিল প্রধান দল কংগ্রেসের মধ্যে, তা উল্লেখ করেছেন। ব্যক্তিদোষ বলে যতই পাশ কেটে যাওয়ার ইচ্ছা থাকুক, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্নরকমই হয়।
.
দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতার ক্ষেত্রে প্রধান অস্ত্রগুলোর একটি হচ্ছে, মুসলিম লিগ আর মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ ক্ষমতার লোভে দেশবিভাগ চেয়েছেন, উম্মাহর স্বার্থে নয়।
এক্ষেত্রে আমি ভাবি ভিন্নভাবে, জিন্নাহর লোভ বাস্তব হলেই একচ্ছত্রক্ষমতা-বিশিষ্ট মুসলিম রাষ্ট্রগঠনের আবশ্যকতা কি তবে মিথ্যা হয়ে যাবে? মুশরিকদের সঙ্গে আন্তরিকতার সঙ্গে বসবাস উচিৎ হয়ে যাবে? যেই দ্বীন এসেছে বিজয়ী হওয়ার জন্যে, তাকে শিরকের সংমিশ্রনে নিয়ে এসে দ্বীনের দীপ্তি নিস্তেজ করা ভালো কাজ হয়ে যাবে? জিন্নাহর সমস্যা ছিল, কিন্তু গান্ধি আর প্যাটেলের প্রশংসাপত্র কোথায়...?
আজের ভারত আমাদেরই সামনে। দ্বিতাজিতত্ত্ব বাস্তবায়ন না হলে ভারত আমাদের ভাই হয়ে থাকত, ওসব মিথ্যাকথা। আমি সুরা বুরুজ পড়েছি, মুশরিকদের নিকট মুমিন বান্দার প্রধান দোষ হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ইমান রাখা।
মানুষকে সৃষ্টি উদ্দেশ্য ইবাদত করা, কিন্তু তাকে সমাজবদ্ধ প্রাণী করার পেছনে উদ্দেশ্য কী? আল্লাহর প্রতিনিধি সেজে তার বিধান বাস্তবায়ন করা নয়কি? কিন্তু মিশ্রজাতীয়তার রাষ্ট্র কি মৌলিকভাবেই সেই অনুমতি দিত? অবশ্য দ্বিজাতিতত্ত্বের রাষ্ট্র পাকিস্তানে যদিও তা বাস্তবায়িত হয়নি, তবে সেই না হওয়া মৌলিকভাবে নিষিদ্ধ ছিল না, বরং অবস্থার ফেরে পড়ে তা থেকে বঞ্চিত হতে হয়েছিল আমাদেরকে; অবশ্য সেখানেও আমরা নিজেদের দায় অস্বীকার করতে পারব না।
দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধিতার ক্ষেত্রে এই যুক্তিও শুনানো হয় যে এর ফলে সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টি হবে এবং দাওয়াতের পথ নষ্ট হবে। কিন্তু আমরা অন্যের ঘর তৈরী করার জন্য নিজের ঘর নির্মাণ বাদ দিয়ে শত্রুর ঘরে আশ্রয় নেওয়ার মতো বোকামি করতে পারি না।
.
যাই হোক, বইটি ভালো এবং উপকারী।
আল্লাহ শাইখুল ইসলাম ও এর রচয়িতাকে বেহিসাব আজর দান করুন এবং আমাদের সকলের মনে সম্প্রীতিদানপূর্বক ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা করবেন।
0