রচনা সম্ভার

রচনা সম্ভার's Category :

রচনা সম্ভার's Publication :

রচনা সম্ভার's Writer :

রচনা সম্ভার


"রচনা সম্ভার" বইটির মূল্য

নতুন বইঃ 159 Taka


"রচনা সম্ভার" বইটির বিস্তারিত

মুদ্রিত মূল্যঃ ৩২০৳
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৩৩৬

লিখেছেনঃ মুহতারাম মাওলানা যাইনুল আবিদীন হাফিযাহুল্লাহ

মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. আমাদের চেতনার সিন্দাবাদ। একদা যাদের উষ্ণ আহ্বানে বেরিয়ে এসেছিলাম কালের জীর্ণ দেয়াল ভেঙ্গে–তিনি তাদের অন্যতম। তার দীপ্তবদন সরল মন্ত্রণা আর গাল্পিক ভাষণের অবাক দ্যোতনা এখনও আলোড়ন তুলে আমাদের অলস প্রহরে। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত চেতনার রেণু এখনও তাপ ছড়ায় আমাদের ভাবনার হিমেল প্রাঙ্গণে। যখন একা হই, চোখ তুলে তাকাই স্মৃতির আকাশে–কী যে আলো ছড়িয়ে যায় এই নাম। চোখ বন্ধ করি, কান পাতি হৃদয় অন্দরে, শুনি হৃদয় বীণায় সেই অগ্রপথিকের সুর–
‘জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত পরাস্থ সৈনিকের মতো
শতাব্দীর নির্জনতা কিংবা বিরাণ স্তুপের মতো
ঝিমিয়ে পড়া এ জাতির ক্রমাগত নৈরাশ্যের ক্ষণে,
ঐতিহ্যভরা অতীতের রক্তলেখা ইতিহাস আর
সুর-শানিত বিক্ষুব্ধ চেতনার গান গেয়ে যাও।
ছিড়ে ফেল মনের আয়েশী পর্দা কিংথার করো শেষ
সজীব প্রাণের মুক্ত শ্বাসে কেটে যাক নেতানো আয়েশ,
নহবতখানায় পুনঃ জঙ্গি দামামা বাজাও।
কে আজ ওগো! মোরে যোদ্ধার বেশে সাজিয়ে দাও।
{কবিতার নাম: আমায় যোদ্ধার বেশে সাজিয়ে দাও।}

মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. আমার শিক্ষক। না, আমি তার প্রথাবাঁধা ছাত্র নই। তিনি আমার শিক্ষক অমর অম্লান এক আদর্শিক চেতনার। হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে চেতনার প্রথম ও শেষ আশ্রয়। পৃথিবীর একশ সত্তর কোটি মুসলমানের বিশ্বাসের শিকড় এসে মিলিত হয়েছে যে চেতনায়। একদা যে চেতনার পীযূষ পান করেছিলাম আমরা আদর্শের এক চিরসবুজ বৃক্ষের ছায়ায়–ইতিহাস সে বৃক্ষের নাম দিয়েছে ‘লাজনাতুত তলাবা বাংলাদেশ।’ ‘কাফেলা’ নির্মাণের স্বপ্নে মুষ্টিবদ্ধ এক কাফেলা। এই কাফেলার শ্রেষ্ঠ চার অগ্রপথিক মাওলানা ইসহাক ফরিদী রহ. মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ. মাওলানা ড. মুশতাক আহমদ ও মাওলানা আবূ সুফিয়ান যাকী। তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত চেতনার শপথ আমাদের রক্তের ভেতর স্বপ্নের বিদ্যুৎ ছড়িয়ে দিত। আমরা আকাশভরা আবেগে আবৃত্তি করতাম–
‘আবূ বকর উসমান ওমর আলী হায়দার
দাঁড়ি যে এ তরীর নাই ওরে নাই ডর।
কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝিমাল্লা
দাঁড়িমুখে সারিগান লা শরীক আল্লাহ।’

ভাবনা-কল্পনা, স্বপ্ন ও শপথে কী যে চঞ্চল সময় পার করেছি। আবেগের উত্তাল ঢেউ আমাদের জরাজীর্ণ অতীতের বসতভিটা মুহূর্তে নামিয়ে নিয়ে যেত বিস্তৃতির অতলে। ক্ষণে ক্ষণে জেগে উঠত স্বপ্ন ভাবনা ও কল্পনার নতুন চর। ঐসব চরের আমরা ভবিষ্যত রাজা। আমাদের কণ্ঠে কম্পিত শ্লোগান–‘তোমাকেই নিতে হবে আগামী পৃথিবীর ভার।’ আমাদের সেই আগামীর দুই অমিততেজ সিপাহসালারকে এতটা তাড়াতাড়ি হারিয়ে ফেলব, কোনদিন ভাবিনি। মহান মনিবের আমোঘ ফয়সালার সামনে সরল আত্মসর্মপণ ছাড়া আর পথ কোথায়? কিন্তু আবেগের আগুনে অঙ্কিত স্মৃতির লিপিকা তো সহজে মোছা যায় না, বরং মুছতে গেলে আগুন আরো তেজি হয়। দহনযন্ত্রণা অতীত বেদনাকে আরো তাজা করে তোলে।

দুই.
২০ মে ২০১৭। শনিবার। একই দিনে প্রিয়তম দুইজন মানুষকে হারিয়েছি। একজন চেতনার অগ্রপথিক মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ., আরেকজন আমাদের প্রিয় উস্তায, দারুল উলূম দেওবন্দের মুহাদ্দিস, কাসেমী দর্শনের বিশ্বস্ত বিশ্লেষক, শানিত দার্শনিক, তারানায়ে দেওবন্দ-এর অমর শিল্পী মাওলানা রিয়াসাত আলী বিজনূরী রহ.। আমি ডায়েরী লিখি না। কিন্তু এই আঘাত আমাকে সাত পৃষ্ঠা ডায়েরী লিখতে বাধ্য করেছে।

এটা সত্য–মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ.-এর সাথে আমাদের সম্পর্ক চেতনা ও আদর্শের। তাঁর সাথে প্রথম পরিচয় চেতনার পাঠশালা–লাজনাতুব তলাবার প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে। স্থান শহীদবাগে। তখন শরহে বেকায়া বা হেদায়া পড়ি। আর করি লাজনাতুত তালাবা। বাতাসে করে সংবাদ এলো প্রতিযোগিতার। বিষয় : নবীজির রাজনৈতিক জীবন। বন্ধুদের প্রেরণায় নামলাম যুদ্ধে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন নিংড়ে রচনা করলাম আমাদের আবেগের প্রাসাদ। ভাষা আর তথ্য কি ছাই। স্বপ্ন ও আবেগটাই বড়। ওই প্রতিযোগিতায় বন্ধু মাওলানা আলমগীর নাসিরাবাদী বিশালায়তন একটা প্রবন্ধ পড়েছিলেন। ওই প্রতিযোগিতায় আমি কলকাতার মাওলানা মুহাম্মদ তাহির রহ. লিখিত ‘বাইবেল ও খৃস্টবাদ’ বইটি পুরস্কার পেয়েছিলাম। যতটুকু মনে করতে পারছি–মুহাম্মদ তাহির সাহেবের ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্যের সাথে প্রথম পরিচিতি হই ওই বই পড়ে। ভাষা, চিন্তা-চেতনা বিনির্মাণে তার বই আমাদের কত যে সাহায্য করেছে তা এক কথায় বলতে পারব না।

এখানে যে কথাটি বিশেষভাবে বলতে চাই তাহলো–ওই প্রতিযোগিতা শেষে দীর্ঘ একটি বক্তৃতা করেছিলেন মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া রহ.। রাজনীতির শব্দ বিশ্লেষণ, গোড়ার ইতিহাস, গ্রীকভাষার এই শব্দের ঐতিহাসিক আভিজাত্য, অতঃপর গর্বের ধর্ম ইসলামে তার অপূর্ব বিকাশ–এইসব তত্ত্ব তুলে ধরেন তিনি তার হাস্যবিধৌত গাল্পিক ভাষার বিরল ব্যঞ্জনায়। তার ভাষার প্রাঞ্জল্য তথ্যের প্রাচুর্য আর আত্মবিশ্বাসের দীপ্তিতে আমরা রীতিমত আন্দোলিত হতে থাকি। একজন আলেমের মুখে এমন সমাজ-ঘনিষ্ঠ বিষয়ে এমন প্রামাণ্য বক্তৃতা শোনার অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকের জীবনেই ছিল প্রথম। ওই অনুষ্ঠানে স্বভাবজাত একখানা সংগ্রামী ভাষণ দিয়েছিলেন তাঁর স্বপ্ন ও সংগ্রামের সহযাত্রী মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক ফরিদী রহ.।

আরো মনে পড়ছে খুবই রসঘন ও আমোদপূর্ণ বয়ান দিয়ে পুরা মজলিসে প্রাণ ছড়িয়ে দিয়েছিলেন আমাদের এই কাফেলার প্রায় সকলের প্রিয় শিক্ষক অসামান্য মেধাবী আলেম মুফতী গোলাম মোস্তফা সাহেব রহ.। মনে পড়ছে ওই মজলিস চলাকালেই মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া রহ. রচনা করেছিলেন লাজনার তারানা। মজলিস শেষে তিনি নিজে তা পড়ে শুনিয়েছিলেন। তারানাটি লাজনার বার্ষিক স্মারকে প্রকাশিত হয়েছিল। শুরুর দু’টি লাইন ছিল সম্ভবত এমন–
‘লাজনা এলো এই ধরাতে নিয়ে আহ্বান
নিদ মহলে বাজল সানাই জাগরে মুসলমান।’

বলতে দ্বিধা নেই, সেই সানাই সুরে আমাদের নিদ ভেঙ্গেছিল। আমরা ঘুমের পাড়া থেকে জেগে উঠেছিলাম। কালের সব অর্কিড মাড়িয়ে এসে সমবেত হয়েছিলাম পূর্বসূরীদের চিন্তা ও আদর্শের ফুলবাগানে। হয়তো আমাদের আঁচল ছিল ছোট। তেমন কিছুই তুলে নিতে পারিনি। কিন্তু সে ফুলবাগিচায় ফুলের অভাব ছিল না। কোন বাধাও ছিল না। আজ ভাবনা বলি, চিন্তা বলি আর দু’চার হরফ লেখা বলি–সবই ওই ফুলবাগানের সুরভিত ফসল। শেখ সাদী ভালো বলেছেন :
جمال هم نشين در من اركن
وكرنه من هما خاكم كه هستم
কহিল ওসব কিছু আমি নহি
আমি অতি নিচু মাটি,
ফুলের সহিত থাকিয়া তাহার
সুবাসে হইনু খাঁটি।

বলতে পেরে অন্তরে স্বস্তিবোধ করছি–এই জীবনে যাদের কাছে পড়েছি, যেখানে যেখানে পড়েছি, কারও দায় শোধ করা সম্ভব নয়। শোধ করতে চাইও না। ওই ঋণ আমাদের মাথার তাজ। জীবনের অলঙ্কার। তারপরও লাজনাতুত তালাবার ঋণটা একটু ব্যতিক্রম। জীবনের ভেতরে ঢুকে জীবন সন্ধান করার যে প্রেরণা, ঘরে থেকে জগত জয় করার যে মন্ত্রণা লাজনা আমাদের দিয়েছিল ওই উঠতি জীবনের স্বপ্ন প্রহরে, তা ছিল যথানিয়মে যথাস্থানে যথাসময়ে বীজ বপন করার যথার্থ প্রয়াস। আমাদের অন্তরে চেতনার ওই চারা রোপন করেছিলেন যারা তাদের প্রথম সারির দুই বিপ্লবী মাওলানা ইসহাক ফরিদী ও মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ.।

মনে পড়ছে–২০ মে শনিবার। সকাল ৯টা হবে হয়তো। হযরতুল উস্তায মাওলানা রিয়াসাত আলী বিজনূরীর ইন্তেকালের সংবাদে আমি ঘরে অস্থির পায়চারী করছিলাম। এরই মধ্যে আওয়ার ইসলামের সম্পাদক মাওলানা হুমায়ুন আইযুব ফোন করে জানাল–হুজুর, মাওলানা আবুল ফাতাহ সাহেব এই মাত্র ইন্তেকাল করেছেন। চোখের সামনে সবটা পৃথিবী যেন ধূসর হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে ছুটে গেলাম হাসপাতালে।

তার প্রিয় দুই পুত্র সাজিদ ও যায়েদকে দেখামাত্র স্মৃতিতে তাজা হয়ে উঠল প্রিয় ছোটভাই সায়েমের এতিম হওয়ার দৃশ্য। ভেবেছিলাম–একনযর দেখে আমার পরম শ্রদ্ধাভাজনের সেই হাসি ছড়ানো মুখখানি। পারলাম না। এখানে যে কথাটি সবিশেষ বলতে চাই তাহলো–যখন তার জানাযায় আসি মালিবাগ জামিয়ায়, কানপেতে শুনতে থাকি বরেণ্যদের মথিত অনুভূতি। অপেক্ষায় থাকি যার–এক সময় তিনিও দাঁড়ান মাইকের সামনে। আমাদের প্রিয় শিক্ষক স্বপ্নজাগানিয়া দীক্ষাগুরু মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী। বাষ্পরুদ্ধ আবেগে উচ্চারণ করেন এক অমর সত্য কথা–‘জীবনে অনেক ছাত্র পড়িয়েছি, কিন্তু মাওলানা ইসহাক ও মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ.-এর মতো ছাত্র জীবনে পাইনি।’

যতটুকু মনে পড়ে, ১৯৮৬ থেকে দেখছি এই কাফেলাকে। দীর্ঘ তিন দশক ধরে যা দেখেছি, শুনেছি ও বুঝেছি, তাতে বলতে দ্বিধা নেই হুজুরের এই মূল্যায়ন আক্ষরিক অর্থেই যথার্থ। আমার জীবনসঙ্গিনীর জনক মাওলানা ইসহাক ফরিদী রহ. ও মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. কতটা কাছের বন্ধু ছিলেন; চিন্তা বোধ রুচি ও চেতনায় পরস্পর কতটা কাছাকাছি ছিলেন তার একটি সহজ উদাহরণ দিই। মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ.-এর বড় ছেলের নাম আবূ নাইম মুহাম্মদ সাজিদ। আর মাওলানা ইসহাক ফরিদী রহ. একমাত্র পুত্র সন্তানের নাম আবূ সাঈদ মুহাম্মদ সায়েম। নিজ বিশ্বাস সন্তান, ছাত্র ও আপনজনদের প্রতি তাদের উভয়ের আবেগ ছিল খুবই সরল। দুই জনই ছাত্র সন্তান আত্মীয় ও আদর্শ সবক্ষেত্রে যেমন সময় দিতেন অবসর মানুষের মত, তেমনি দরদভরা পরামর্শ আর পুরো পকেট উজাড় করে দিতেন অপরিণামদর্শী প্রেমিকের মত।

ধর্ম আদর্শ ও মানবতার এমন সরল প্রেমিক সমাজে খুব বেশি জন্মায় না। তাদের সহযাত্রী যারা বেঁচে আছেন, আশা করি সকলেই স্বীকার করবেন–লাজনাতুত তালাবার চিন্তা আদর্শ ও মিশনের সঙ্গে তো অনেকেই ছিলেন। কিন্তু প্রাণ ও পকেটসহ নিজেকে উৎসর্গ করার ক্ষেত্রে তাদের উপমা ছিলেন তারাই। বন্ধুত্ব উদারতা ও মুক্ত হস্তের গুণে পরস্পর ছিলেন আমরণ ঘনিষ্ঠ। দুইজনই কর্মমুখী চিন্তায় বিশ্বাসী ছিলেন। কর্মহীন অলস দর্শনবিলাসকে পছন্দ করতেন না তাদের কেউই। ফলে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুসমাজের সামাজিক সকল কর্তব্য সামাল দেয়ার পরও মন দিয়েছেন। নিয়মিত শিক্ষকতা করেছেন, প্রাণ ছড়িয়েছেন জাতীয় নেতৃত্বে। যারা দেখেছেন তারা হয়তো তর্ক করবেন না, দেশের জাতীয় কর্ম ও নেতৃত্বে তাদের আসন ছিল বয়সের চাইতে খানিকটা উপরে। স্বীকৃতির উপরের সিঁড়িতে উঠে গেলে মানুষ পেছনের কথা ভুলে যায়, এমন কথা বাতাসে শোনা যায়। কিন্তু মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. ও মাওলানা ইসহাক ফরিদী রহ.-কে দেখেছি এর উল্টা। বন্ধু শিক্ষক তো অনেক পরের কথা–এক যমানার ছাত্র কিংবা লাজনার সামন্য সদস্যকে আজীবন ভুলেননি। অবহেলা করেননি। আমার বড় ছেলে সালমান আদীবের জন্মের পর আকীকার অনুষ্ঠানে আগের দিন ফোন করে দাওয়াত দিয়েছিলেন আমার শ্বশুর। মাওলানা আবুল ফাতাহ সাহেব যথাসময়ে মিষ্টি হাতে চলে আসেন। আমি কিংবা আমার মত যারাই তার মালিবাগ জামিয়া কিংবা আনসার কোয়ার্টার মসজিদে গিয়ে উঠেছি, প্রথম সাক্ষাতেই নির্মল হাসিতে প্রাণ ভরে নিয়েছেন। মনের যমীন উপুড় করে ঢেলে দিয়েছেন অসম উদারতা। ভাবনার কথা, স্বপ্নের কথা, স্বপ্নভঙ্গের কথা সবই বলতেন অকৃপণ কণ্ঠে। ভাবি, এমন মনখোলা উদারপ্রাণ অগ্রপথিক কি আর পাব?

তিন.
কাক ও কবির সংখ্যা নিয়ে একটি মজার কৌতুক আছে আমাদের ঢাকা শহরে। ওই কৌতুকের বিদ্যুৎ এখন আমাদের অঙ্গনেও চোখ ধাঁধায়। এই আমাদের কওমী অঙ্গনেও এখন কবি ছড়াকার উপন্যাসিক গল্পকার ও লেখকের ভীষণ ভীড়। দুআ করি ‘আল্লাহুম্মা যিদ ফাযিদ’- আকাশ ভরে দাও হে খোদা! আমাদের কলম সৈনিকে। কিন্তু মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. যখন আশির দশকের শেষলগ্নে এসে কলমের শ্লোগানে মুষ্টিবদ্ধ হন তখন আমাদের কওমীপাড়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নরকম। বই পড়ার অপরাধে মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. একবার বহিস্কারের মুখোমুখী হয়েছিলেন ঢাকার এক বড় মাদরাসায়। সংবাদ পেয়ে ছুটে আসেন তার একজন প্রিয় শিক্ষক। এই বলে তাকে ফাঁসি থেকে রক্ষা করেন–‘বই পড়বি তো মশারি টানিয়ে পড়বি। যাহ…। মনে পড়ে মাওলানা আবুল ফাতাহ সাহেব যখন ‘আল্লাহর পথে সংগ্রাম’ বইখানা লেখেন, আমরা কী যে আলোড়িত হয়েছিলাম। সেই স্মৃতি এখনো আমাদের আন্দোলিত করে।

সাহিত্য ও লেখালেখির ময়দানে মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ.-এর স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদার জায়গাটা নির্ধারণ করতে হলে–১. তার কাল, ২. সমকালীন চিন্তা ও চরিত্র এবং ৩. তার ও তাদের সাধনার মৌলিক লক্ষ্যটা আগে পরিস্কার করে নিতে হবে। বেশিদিন আগের কথা তো নয়। তারপর এই সময়ের তরুণদের কাছে অনেকটা অবাক করার মত ব্যাপার, ভাষা আন্দোলন হয়েছে ১৯৫২ সালে। আমরা কথা বলছি আশির দশকের শেষ লগ্নের। এর মধ্যে ভাষা আন্দোলন গেছে, গেছে স্বাধীনতা যুদ্ধ। বাঁক ঘুরে দাঁড়িয়েছে হাফেজ্জী হুজুরের খেলাফত। কিন্তু এই সময়ও দেখেছি–বাঁক ঘুরেনি আমাদের মন ও মননের। মায়ের ভাষা চর্চাকে মনে করা হতো জঘন্য অপরাধ। বাংলাকে অস্পৃশ্য ও অপবিত্র মনে করা হতো। আমাদের প্রায় মাদরাসাই ছিল পাঠ্যগ্রন্থে মহাতুষ্ট। এই ইলমী তুষ্টির পাগলামী ছিল চরম সমাজবিমুখতা। পড়াশোনা চিন্তাভাবনা আচার-আচরণ সব বিচারেই সমাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক জাতি হিসেবে গড়ে ওঠেন তারা। মাদরাসা শিক্ষিতদের এই চিন্তার সীমাবদ্ধতা, দৃষ্টিভঙ্গির একদেশ দর্শিতা আর সমাজের প্রতি বিরাগ মনোভাব সমাজের সামনে মাদরাসা শিক্ষাকেই আবেদনহীন করে তুলে। ভাষাগত দূর্বলতা মাদরাসা শিক্ষা ও প্রচলিত ভাবনার দূরত্বকে করে তুলে আরও কঠিন।

দূরত্বের এই দেয়াল ভাঙ্গার জন্য এ সময় উদ্যোগী হয়েছেন, সংগ্রাম করেছেন হযরত মাওলানা আতহার আলী রহ. ও মাওলানা নূর মুহাম্মদ আজমীর রহ.। পরবর্তী সময়ে তাদেরই চেতনার পতাকা হাতে দাঁড়াতে হয়েছে মাওলানা আবুল ফাতাহ সাহেবদের। সুতরাং তারা কর্মবীর ছিলেন না শুধু, ছিলেন সংগ্রামীও। তাদের সংগ্রামেও একদা কালের মুখ ফিরেছে। বাংলা চর্চা বৈধতা পেয়েছে। আর এখন তো রীতিমতো পূজ্য। সুতরাং কতটা বই লিখেছেন সেই সংখ্যা দিয়ে তাদের বিচার করা যাবে না। আমরা এখন যারা লিখছি, দৃষ্টিনন্দন কভার পরে আমাদের যাদের এখন নিত্যনতুন বই প্রকাশিত হয়, আমাদের এই সকল অর্জনের সাথে মিশে আছে তাদের বিপ্লবের রেণু। তাছাড়া আমাদের লেখালেখি আর তাদের লেখালেখির একটা কেন্দ্রীয় প্রাথর্র্ক্য হল তারা লিখেছেন আদর্শিক দায়বদ্ধতা থেকে।

পবিত্র ইসলামকে পরিপূর্ণরূপে জানা ও তার পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাকে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার মহান মন্ত্রে মাওলানা আবুল ফাতাহ এবং তাঁর সতীর্থরা ছিলেন বিসর্জিতপ্রাণ। এই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাকে যথাযথ আবেদনসহ সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হলে চাই একদল প্রশিক্ষিত সৈনিক। লাজনা ছিল সেই সৈনিক নির্মাণের পাঠশালা। এই পাঠশালার মহান দুই ইমাম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ এবং মাওলান নূর হোসাইন কাসেমী। মাওলানা আবুল ফাতাহ আর মাওলানা ইসহাক ফরিদী শ্রেষ্ঠ দুই শিষ্য এবং কাফেলার সেরা দুই অধিনায়ক।

সায়্যিদুনা হযরত আবূ বকর সিদ্দীক রা.-এর অমর উচ্চারণ–أينقص الدين وأنا حي؟ –আল্লাহর দ্বীন সামান্য ক্ষতিগ্রস্থ হবে আর আমি বেঁচে থাকব? এর বিদ্যুৎ বিভাকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার আকুলতা কী যে অস্থির করে রাখত।-এই দুই সিপাহসালারকে যারা দেখেননি তাদেরকে তো লিখে বোঝাতে পারব না। তবুও তার লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিই–‘কিন্তু আজ সর্বত্রই কী যেন এক হতাশা, স্থবিরতা অমনোযোগিতা আত্মবিস্মৃতি ও হীনমন্যতা বিরাজ করছে। পূর্বসূরীদের কর্মতৎপরতা ও তোজোদীপ্ত রঙ আজ আর আমাদের মাঝে প্রতিফলিত হতে দেখা যায় না। মুজাহাদা-কুরবানী, আত্মপ্রত্যয়, কোনো ক্ষেত্রেই আজ তাদের উসওয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে না। দুনিয়াজোড়া বাতিল অতি স্বাচ্ছন্দ্যে বিস্তার করে চলছে ধ্বংসাত্মাক ষড়যন্ত্রের জাল। বিশ্বময় নেমে আসছে শয়তানিয়াতের সর্বগ্রাসী আঁধারের সয়লাব। কিন্তু আমাদের কেউ আজ আর তাদের প্রতি আঙ্গুলি-নির্দেশ করছে না, কিংবা গর্জে উঠছে না বাতিলের সামনে। আলীর হায়দারী হুঙ্কার, ঝলমলিয়ে উঠছে না দু’ধারী তরবারী। সত্যের সৈনিকের বজ্র পদচারণায় শঙ্কিত হয়ে কেঁপে উঠেছে না জুলুমাতের ভীতগুলি। হকের তাজা রক্ত দিয়ে কেউ আর রুখতে আসছে না ঘৃণ্য হায়ওয়ানিয়াতের অশুভ পাঁয়তারা। দীপ্ত হয়ে উঠছে না আজ শহীদী রক্তে মানুষের জিন্দেগানী। হৃদয়ের এই উত্তাপ ও দহনযন্ত্রণাকে আরও উসকে দিচ্ছে এই বলে…

‘আমরা জানি না, অতীতের কত শত বাতিলের মুখোমুখি হয়েছে আমাদের ইতিহাস। জানি না সেসব বাতিলের সঠিক পরিচয়। আরও জানিনা, তা প্রতিহত-করণে আমাদের আকাবিরদের ভূমিকা কী ছিল। আমরা জানি না, কেন ইমাম আবূ হানিফা রহ. কারাবরণ করেছিলেন? জানি না কেন ইমাম শাফেয়ী রহ.-এর আঙ্গুলগুলো ভেঙ্গে দেয়া হয়েছিল? কেন চরম নির্যাতন ও বেত্রাঘাতের মুখেও ইমাম আহমদ রহ. আপন সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন? কেন আন্দোলনের ডাক দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ইবনে তাইমিয়া রহ.? কেন প্রতিবাদ-মুখর হয়েছিলেন মুজাদ্দিদে আলফেসানী রহ.? কেন অশুভ শক্তির হীন পাঁয়তারার পূর্বাভাস দিয়ে চিৎকার করে উঠেছিলেন শাহ ওয়ালী উল্লাহ রহ.? কেন বালাকোটে শহীদ হয়েছিলেন হাজারো মুসলমান? {মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ., আল্লাহর পথে সংগ্রাম : ১৭-১৮ পৃষ্ঠা}

যারা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের আলেমসমাজের কথা জানেন, ওই বদ্ধরুদ্ধ পরিবেশে জামাত-শিবিরের আলেম-উলামা-বিরোধী গরল প্রোপাগাণ্ডার কথা জানেন, জানেন ওই হতাশা গ্রাসিত পরিবেশে পূর্বসূরীর সোনাঝরা ইতিহাসের চেতনার অল্পকজন তরুণের শপথ নেয়ার গল্প, জেগে ওঠার গল্প ‘ছাত্র ঐক্য’ নামে, তারা ভালো বুঝবেন আবুল ফাতাহ রহ.-এর ওই কথাগুলোর মর্ম।
ভাবা যায় সতীর্থ শিক্ষার্থীদের পূর্বসূরীদের জীবন চেতনার জাগিয়ে তোলবার শপথে হেদায়া-জালালাইন পড়বার সময়েই ঘুরে বেড়িয়েছেন চট্রগ্রাম, মোমেনশাহী, নোয়াখালী, কুমিল্লা-সহ দেশের বিভিন্ন জেলা।

একই শপথ তলে যূথবদ্ধ করেছেন প্রায় পাঁচ হাজার ছাত্রকে এবং সেটা আশি-একাশি সালের কথা। ছাত্র ঐক্যের চার সংগ্রামী তরুণ মাওলানা আবুল ফাতাহ, মাওলানা ইসহাক ফরিদী, মাওলানা মুশতাক আহমদ ও আবূ সুফিয়ানই পরবর্তী চেতনার পাঠশালা লাজনাতুত তালাবার মহান কাণ্ডারী। সুতরাং তাদেরকে কি শুধু লেখক বলা চলে? তারা আমাদের জাগৃতির বাঁশিওয়ালা, চেতনার পুরোধা ও আদর্শের সানাই-বাদক। তাই ভবিষ্যতে কেউ যদি তাদের অবদানকে বই সংখ্যা ও সামাজিক পদ ও পদবী দিয়ে বিচার করেন, মনে করি সে হবে মস্ত বড় ভুল।

দুভার্গ্য আমাদের, ছাত্র ঐক্য থেকে উঠে আসা চেতনার বীজতলা লাজনাতুত তলাবাও একদা শুকিয়ে যায়। চর্চা ও চিন্তার প্রিয় প্রাঙ্গন ‘ইসলামী গবেষণা পরিষদ’ হারিয়ে বসে আবেগের জৌলুস। থেকে যায় চেতনার লেনদেন। ওই সময়কার কথা বলেছেন মাওলানা আবুল ফাতাহ বন্ধু ইসহাক ফরিদীর স্মৃতিচারণ করেতে গিয়ে–‘আমি আর মাওলানা ইসহাক সিদ্ধান্ত নিলাম, গবেষণা পরিষদের মাধ্যমে গবেষণার কাজ না হলেও আমাদের বসে থাকার কোনো অর্থ হয় না। আমাদের সীমিত জ্ঞান নিয়ে আমরা প্রত্যেকেই নিজে নিজে কিছু কাজ করে যাব। সে থেকেই লেখালেখির পথে আমার ও মাওলানা ইসহাক সাহেবের যাত্রা। তবে শুধু বই লেখার জন্যেই নয় আগামী দিনে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে পথযাত্রীদের কাজে আসে এমন কিছু লেখা। এটাই ছিল আমাদের লেখার উদ্দেশ্য। আমরা জ্ঞানের স্বল্পতার জন্য গভীর জ্ঞানের কিছু লিখতে পারিনি হয়ত, তবে আগামী প্রজন্মের প্রয়োজনের কথা সামনে রেখেই লেখার চেষ্টা করেছি। মাওলানা ইসহাকের লেখা বই গুলো ওল্টালে এর পরিস্কার ছাপ লক্ষ্য করবে।’ (লেখার শিরোনাম : জাতীয় চেতনার অগ্রগতিতে মাওলানা ইসহাক ফরিদীর অবদান অমর হয়ে থাকবে।)

চার.
কম লিখেছেন কি বেশি লিখেছেন সেটা বড় কথা নয়। যারা তার লেখা পড়েছেন, তারা স্বীকার করবেন মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. ছিলেন একজন জাত লেখক। উচ্চ শব্দ চয়ন, বাক্যের কাব্যিক গাঁথুনি, বর্ণনায় ঝর্ণার মতো গতি, নদীর মত তরঙ্গময়তা, উপস্থাপনায় দৃঢ়তা, বিষয় ও বক্তব্যে মিশনারী ও আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং হারানো গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে ফিরিয়ে আনার উদগ্র বাসনা তার রচনাকে বরাবর করেছে মোহন। ভাবি আমরাও লিখছি, লিখছেন অনেকেই এবং লিখবেনও। কিন্তু তাদের মতো দরদমাখাস্বপ্ন ও যন্ত্রণা নিয়ে, দিনের বিজয় নেশায় আকুল হয়ে ক’জন লিখবেন? পাঞ্জেরীর মত চোখ আর সিন্দাবাদের উৎসাহ নিয়ে কলম ধরবে আর কে? তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বইয়ের নাম নিই–১. দেওবন্দ আন্দোলন: ইতিহাস ঐতিহ্য অবদান। ২. ইসলামী অর্থনীতির আধুনিক রূপায়ন। ৩.আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইসলাম। ৪.ইসলামী আইন ও বিচার ব্যবস্থা। ৬.হাদীস অধ্যয়নের মূলনীতি। ৭. স্রষ্টা ও তাঁর স্বরূপ সন্ধানে।

বইয়ের এইসব শিরোনাম তার বিশাল চিন্তা মনোযোগী পাঠ ও মেধার প্রখরতার বর্ণিত ইশারা। চতুর ও দস্যু ইংরেজদের গরম শিক্ষা আমাদের সবুজ মাতভূমিতে যে বর্ণিল ক্লেদ ছড়িয়েছে, দেশ-জাতি ও সমাজকে ওই ক্লেদের অতল থেকে বের করে আনার কথা ভাবতেন অহর্নিশ। যখনই দেখা হত, কথা হত লেখালেখির বিষয়ে ওই চেতনাই তার কণ্ঠে উচ্চারিত হত। মনে পড়ে–তার ইন্তেকালের বছরখানেক আগের কথা। এক্সিডেন্টের পর তখনও একা হাঁটতে পারেন না। আমাদের পারিবারিক একটা বিষয়ে কথা বলবেন বলে ফোন করলেন, আমি ও আমার ছোটভাই আবূ সাঈদ মুহাম্মদ সায়েম দেখা করতে যাই। সামান্য কুশল বিনিময়ের পর প্রথমেই তুলে আনেন আমার সামান্য রচনা ‘ইসলামে জীবিকার নিরাপত্তা’ প্রসঙ্গ। মানবজীবনের খুবই গুরুত্বপূর্র্ণ একটি বিষয়ে চমৎকার কাজ হয়েছে বলে পরম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। বিশেষকরে বিপুল পরিমাণ ঘটনার উল্লেখ বইটিকে জীবনঘনিষ্ঠ করে তুলেছে বলে এতটাই তৃপ্তি প্রকাশ করেন যে, আমি লজ্জায় কুঞ্চিত হয়ে পড়ি। ভেবে অবাক হই, এমন অসুস্থতার মধ্যেও মানুষ লেখালেখি নিয়ে এতটা তাড়িত হতে পারেন? আসলে অন্তরে কী যে ‘মন’ পুষতেন, তা এই সমাজের পক্ষে বোঝা সহজ ছিল না। এমন ঐশ্বর্যপ্রাণ মানুষ কি আর পৃথিবী পাবে?

আরেকটি স্মৃতির কথা বলি। আমার ডায়েরীর ভাষায় ২০১৫ ইংরেজি’র ডিসেম্বরে আমার একটা বই বেরোয়। নাম ‘ইমাম আবূ হানিফা রহ. আকাশে অংকিত নাম।’ আমি বইটি উৎসর্গ করি এই ভাষায়–‘লাজনাতুত তালাবা বাংলাদেশ। চেতনার শেখর ছুঁয়েছিলাম যেখানে।’ মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. তখন শয্যাশায়ী। স্ট্রোক করেছেন। তবুও আবেগে মালিবাগের উস্তায প্রিয় মানুষ মাওলানা ফখরুল ইসলাম সাহেবকে সাথে নিয়ে তাঁর বাসায় যাই। তিনি বহু কষ্টে এসে আমাদের সাথে বসেন। কথা বলার চেষ্টা করেন। শব্দ অস্পষ্ট। আমি উৎসর্গপত্রটা দেখিয়ে লাজনার নাম বলতেই চেহারায় হালকা একটা হাসির রেখা ফুটে উঠে। হায়, চেতনার এমন আপনজন কি আর পাব? যখন ভাবি তখন নিজেকে খুবই একা মনে হয়। যে চেতনা ও আদর্শে আমরা বেড়ে উঠেছি, মরণ পর্যন্ত ওই চিন্তা ও দর্শন থেকে এক আঙ্গুল সরেননি এই দুই সিপাহসালার।

হয়তো রুটিন বদল হয়েছে, কিন্তু পথচলা বদল হয়নি। শহীদবাগ থেকে ওফাত–প্রায় তিন দশক সাল দেখেছি, শুনেছি, উপলব্ধি করেছি, বারবার অবাক ও আপ্লুত হয়েছি।

২০০৩ ইং. বা ২০০৪ ইং. সালের কথা। লাজনাতুত তলাবা তখন ইতিহাস। আমাদের সবার প্রিয় উস্তায, আদর্শিক অহঙ্কার, কাসেমী কাফেলার অগ্রনায়ক মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী তখন জমিয়তের প্রাণপুরুষ। হুজুর একবার তাঁর এই প্রিয় দুই শিষ্যকে ডাকলেন ছাত্র জমিয়ত বিষয়ে কথা বলার জন্যে।

মূল ও মূখ্য মেহমান মাওলানা ইসহাক ফরিদী রহ. ও মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. যাওয়ার পথে আমাকেও সাথে নিয়ে গেলেন। দেখে হুজুরও খুশি হলেন। দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা হল–সময়ের প্রেক্ষাপটে যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন ও বর্তমান গুণাবলী সম্পন্ন নেতৃত্বের অভাব এবং এই অভাব পূরণে প্রশিক্ষিত জামাত গঠনের প্রয়োজনীয়তাসহ আরো অনেক বিষয়। ওইসব আলোচনার আলোকে কিভাবে ছাত্র জমিয়তকে ঢেলে সাজানো যায় তার একটি লিখিত খসড়া দাঁড় করাবার দায়িত্ব অর্পিত হয় আমার কাঁধে। নির্ধারিত হয় পরবর্তী বৈঠকের তারিখ। আমি মজলিসের নোট, লাজনার চেতনা ব্যক্তিগত পড়াশোনার আলোকে একটি খসড়া প্রস্তুত করি।

তখন রমযান। এক রাতে তারাবীহ পড়ে এই মহান দুই অগ্রপথিকের সাথে বারিধারা মাদরাসায় যাই। হুজুর মসজিদে ই’তিকাফরত। সেখানে শুরু হল বৈঠক। আমি লিখিত খসড়া পাঠ করতে শুরু করলাম। এক দুই প্যারা পড়তেই মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. আমাকে এই বলে থামিয়ে দিতেন–শোনেন, শোনেন! আপনি হুজুর সামনে এটা ভুলে গিয়ে আপনার মত করে পড়ুন। তাহলে আপনার লেখার আগুন আমাদের শরীর স্পর্শ করবে। এবার আমি সত্যি সত্যি আবেগের সাথে পড়তে থাকি। শব্দ ভাষা বিষয় প্রয়োজনমত পরামর্শ ও রদবদল হতে থাকে। সময় গলে যেতে থাকে।

তখন রাতের প্রায় শেষ প্রহর। আমি পড়ছি। এরই মধ্যে হঠাৎ জামার হাতা গোটাতে গোটাতে ভরাট ও আদেশের সুরে, ‘মাওলানা যাইনুল! থামেন থামেন…।’ আমি নীরব। আবুল ফাতাহ রহ. নতুন একটা পান মুখে পুরতে পুরতে আমার শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে ‘ইসহাক ভাই! একবার তো তারুণ্যের এই নেশায় সারা দেশ চষে বেড়ালাম। আবার চলেন, বুড়ো বয়সে আরেকবার নামি।’ আমার শ্বশুরও একই ভঙ্গিতে আস্তিন গোটাতে গোটাতে বললেন ‘হুজুর যদি রাজি থাকেন আমি একশ ভাগ প্রস্তুত।’ আমি দেখেছি, দুইজনের চেহারায় বিপ্লবের অবরুদ্ধ আগুন যেন নাচানাচি করছে। চোখ থেকে ঠিকরে পড়ছে দীপ্তি। মাওলানা আবুল ফাতাহ রহ. আমার শ্বশুরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন, ইন্তেকালের সপ্তাহ দশদিন আগে দুইজনের একান্তে কথা হয়েছে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আবার শুরু করবেন একসাথে …।

বাতিলের অনুক্ষণ চক্রান্ত থাবায় রক্তাক্ত ও বিচ্ছিন্ন স্বজাতিকে রাজপথে তুলে আনবার কী যে আকুলতা ছিল মনে। যোগ্য, বিদ্বান, সাহসী, বিচক্ষণ নেতৃত্ব বিনির্মাণে স্বপ্ন আগুন হয়ে দহন করত সদা তাদের প্রাণ। ওই দহনে পুড়তে পুড়তেই বিদায় নিলেন। কীভাবে ভুলি চেতনার ওই সিন্দাবাদদের। মন ভেঙ্গে যায়। নজরুলের সঙ্গে বসে আবৃত্তি করি–
‘আমাদের শত ব্যথিত হৃদয়ে
জাগিয়া রহিবে তুমি ব্যথা হয়ে,
হলে পরিজন চির পরিচয়ে
পুনঃপাব তার দরশন
এ নহে পথের আলাপন।
0