দু'আ কবুলের গল্পগুলো

দু'আ কবুলের গল্পগুলো's Category :

দু'আ কবুলের গল্পগুলো's Publication :

দু'আ কবুলের গল্পগুলো's Writer :

দু'আ কবুলের গল্পগুলো


"দু'আ কবুলের গল্পগুলো" বইটির মূল্য

নতুন বইঃ 189 Taka


"দু'আ কবুলের গল্পগুলো" বইটির বিস্তারিত

অনুবাদ, সংগ্রহ ও সম্পাদনাঃ রাজিব হাসান
পৃষ্ঠাঃ ২১৬
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৮০ টাকা

ডঃ সায়ীদের একদিন
_______________________________

ড: সায়ীদ, মেডিক্যাল জগতে সুপরিচিত একটি নাম। একবার তিনি পাকিস্তানের এক শহরে গুরুত্বপূর্ণ এক মেডিক্যাল কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছিলেন। সে কনফারেন্সে তাকে তার সদ্য শেষ হওয়া মেডিক্যাল রিসার্চের জন্য এওয়ার্ড প্রদান করা হবে।

.
যখন বিমানবন্দরের দিকে যাচ্ছিলেন তখন তাকে প্রচন্ড উচ্ছ্বসিত দেখাচ্ছিল। সেই সাথে কনফারেন্সে দ্রূত পৌঁছানোর জন্য তিনি যেন উন্মুখ হয়ে উঠেছিলেন। আর উঠবেনই না কেন? দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন তিনি এই রিসার্চের পিছনে। এই এওয়ার্ড তো তারই প্রাপ্য। এগুলি ভাবতে ভাবতে বিমানবন্দরে পৌঁছলেন তিনি।

.
প্রায় ঘন্টাখানে হল বিমান চলছে । হঠাৎ পাইলটের তরফ থেকে ঘোষণা এলো যে, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণ দেখা দিয়েছে বিমানটিতে। নিকটস্থ বিমানবন্দরে “জরুরী অবতরণ" করাতে হবে। রাজ্যের দুশ্চিন্তা ড: সায়ীদের কপালে। তিনি হয়ত আর কনফারেন্সে সময়মত অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। বিমানটি অবতরণ করা মাত্রই ড: অনুসন্ধান ডেস্কে দৌড়ে গেলেন। তথ্যদাতা মহিলাকে নিজের পরিচয় দিলেন। যে কনফারেন্সে যাচ্ছেন সেটার গুরুত্ব বর্ণনা করলেন। জানতে চাইলেন গন্তব্যে পৌঁছানোর ভিন্ন কোন উপায় আছে কিনা! যাতে করে তিনি সময়মত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন ।

.
ভদ্রমহিলা তাকে নিরাশ করে দিয়ে বললেন যে, “আসলে পরবর্তী ১৬ ঘন্টায় কোন ফ্লাইট নেই ঐ রূটে। তাই আমার পক্ষে কোনভাবেই আপনাকে সহযোগীতা করা সম্ভব নয়।”
কিন্তু ভদ্র-মহিলা তাকে পরামর্শ দিলেন তিনি যেন একটা কার ভাড়া করেন। কেননা স্থলপথে মাত্র ০৩ ঘন্টা লাগবে গন্তব্যে পৌঁছাতে। কোন উপায়ন্তর না দেখে ড: অগত্যা এই পথই বেছে নিলেন দীর্ঘ পথ আর দীর্ঘ সময়ের যাত্রা হওয়া সত্বেও।

.
এবার বিমান ছেড়ে ডক্টর একটা গাড়ি ভাড়া করে যাত্রা শুরু করলেন। কিছুদুর যাওয়া মাত্রই হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তন হতে শুরু হতে লাগল। আকাশ ভারী হতে শুরু করল। বইতে লাগলো ঝড়ো হাওয়া। প্রচন্ড ঝড় শুরু হয়ে গেল চারদিকে। প্রবল বর্ষণের ফলে চারদিকে কিছু দেখা যাচ্ছিল না। আবছা অন্ধকারে ভালোভাবে সামনের রাস্তা দেখতে পারছিল না ড্রাইভার। তাই মূল রাস্তা ছেড়ে গন্তব্যের দিকে যে মোড় ছিল সেটা ভুলে অন্য আরেক রাস্তায় এগিয়ে চলল গাড়ী । এভাবে দুই ঘন্টা পথ চলার পর বুঝতে পারলেন যে তারা পথ ভুল করেছেন। হারিয়ে গেছেন।

.
প্রচন্ড বৃষ্টিতে এই পঙ্কিল-পথ ভ্রমণ করে ড: ক্লান্ত ও ক্ষুধার্তবোধ করছিলেন। তিনি উন্মত্ত হয়ে এদিক-সেদিক দেখছিলেন যে কোন খাবারের ব্যবস্থা হয় আছে কি না? এদিক সেদিক খোঁজাখুঁজির পর তিনি সামান্য দূরেই ছোট্ট একটা কুঁড়েঘর দেখতে পেলেন। দ্রুত গাড়ি থেকে নেমে সে ঘরের দিকে তিনি এগিয়ে গেলেন। দরজায় কড়া নাড়লেন।

.
ছোট গড়নের এক বৃদ্ধা মহিলা দরজা খুলে দিলেন। ড: তার পথ হারানোর কথা বললেন আর তাদের বাড়ির ল্যান্ডফোন ব্যবহার করতে চাইলেন।

বৃদ্ধা মহিলা বললেন যে, তাদের বাড়িতে কোন ল্যান্ডফোন বা বিদ্যূৎ নেই। কিন্তু পথহারা এই পথিককে রাতের খাবার আর কিছু পান করার জন্য স্বাগত জানাতে ভুললেন না বৃদ্ধা মহিলাটি। তারপর না হয় সঠিক পথ খুঁজে চলে যাবে ডক্টর। প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত আর ক্লান্ত ডক্টর তার এই উপস্থিত দাওয়াত কবুল করলেন (উপায়ও ছিল না কোন) । তিনি ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলেন।

বৃদ্ধা মহিলা তাকে টেবিলে রাখা খাবার আর গরম চা দেখিয়ে দিলেন। আর তাকে এগুলো খেতে বলে সলাত আদায়ের জন্য বিদায় নিলেন। মোমের মিটিমিটি আলোয় চেয়ারে বসে চা খেতে খেতে ডক্টর লক্ষ্য করলেন মহিলা যেখানে নামাজ পড়ছিলেন তার পাশেই ছোট্ট একটা দোলনা রাখা আছে। প্রতিবারই বৃদ্ধা নামাজ শেষ করছিলেন আর নতুন করে শুরু করছিলেন। প্রতিটি সিজদায় তিনি বারবার দু'য়া করেই যাচ্ছিলেন। আর প্রতিবার নামাজ শেষে দোলনাটিতে হাল্কা দোলা দিচ্ছিলেন।

.
ডক্টর বুঝলেন বৃদ্ধার হয়ত কোন সাহায্য প্রয়োজন, তাই তার পরবর্তী নামাজ শেষ হওয়া মাত্রই কথা বলার সুযোগ লুফে নিলেন। ডক্টর বললেন, “আশা করি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আপনার দু'য়াসমূহ কবুল করেছেন”। আমি লক্ষ্য করছিলাম যে আপনি অনেক দু'য়া করেছেন। বৃদ্ধাকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কোনকিছুর প্রয়োজন আছে কি না যার মাধ্যমে আমি আপনার উপকারে আসতে পারি? বৃদ্ধা হাসলেন আর বললেন, “একটি মাত্র দু'য়া ছাড়া আল্লাহ্ আমার সব দু'য়া কবুল করেছেন”। তিনি আরো বললেন, “জানিনা কেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা আমার এই দু'য়াটি কবুল করেন নি এখনো। সম্ভবত আমার দুর্বল ঈমানের কারণেই এরকম হয়েছে”
.

ডঃ তাকে তার সেই দু'য়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি আমাকে বলবেন, আপনার কোন দু’আ আল্লাহ্ তা’আলা এখনো কবুল করেননি?” বৃদ্ধা মাথা নীচু করে বললেন, দোলনার শিশুটি আমার নাতী। কিছুদিন হল ওর বাবা-মা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে। বাচ্চাটির দুরারোগ্য এক ক্যান্সার হয়েছে। যে সব ডাক্তারকে দেখানো হয়েছে, তারা সবাই হাল ছেড়ে দিয়েছেন। বৃদ্ধা আরো বললেন, আমাকে তারা এও বলেছে যে, একজন ডাক্তার আছেন যিনি কিনা আমার নাতীর যে দুরারোগ্য ক্যান্সার হয়েছে তার উপর বিশেষজ্ঞ। কিন্তু তিনি এতদুরে থাকেন যে, তার কাছে পৌঁছানোর কোন উপায়ই নেই আমার। তাই আমি দিন-রাত আল্লাহ'র উদ্দেশ্যে নামাজ, ইবাদত, দু'য়ায় মশগুল থাকি যেন আল্লাহ্ ড: সায়ীদের সাথে আমাকে সাক্ষাৎ করিয়ে দেন। আমার নাতীর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করিয়ে দেন।

.
টপটপ করে চোখের পানি ঝরছে। অশ্রুর সে ধারা গড়িয়ে পড়ছে ড: সায়ীদের গাল জুড়ে।
তিনি বললেন, "সুবহানাল্লাহ! এখন আমি বুঝতে পারলাম, প্লেনের যান্ত্রিক ত্রুটি, প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টিতে আমার পথ হারানো, পথ হারিয়ে ঠিক এ বাড়িতেই আসা- এ সবকিছুই কেন হয়েছে! কারণ আল্লাহ শুধু ড: সায়ীদকে খুঁজে পেতে আপনার দু'য়াই কবুল করেননি, বরং সেই দু'য়া ড:সায়ীদকেই আপনার ঘর পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। আমিই ড: সায়ীদ।

.
বৃদ্ধার দুচোখ বেয়ে অশ্রুকণা। মহান আল্লাহ্র প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে দু হাত তুলে দু'য়া করতে লাগলেন: "ওহ আল্লাহ! কত মহান তুমি। তুমি কতোই না দয়াময়।"
0