তাওবাহ'র গল্প

তাওবাহ'র গল্প's Category :

তাওবাহ'র গল্প's Publication :

তাওবাহ'র গল্প's Writer :

তাওবাহ'র গল্প


"তাওবাহ'র গল্প" বইটির মূল্য

নতুন বইঃ 169 Taka


"তাওবাহ'র গল্প" বইটির বিস্তারিত

সম্পাদনাঃ রাজিব হাসান
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৬০
মুদ্রিত মূল্যঃ ২৫০ টাকা

"তারা তিনজন"

মদিনার আনসারদের তিনজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি - যারা স্রেফ সাময়িক বিচ্যুতির কারণে জিহাদে গমন থেকে পিছিয়ে ছিলেন। জিহাদ শেষ হলে তাঁরা ওযর-আপত্তি না তুলে বিজয় নিয়ে ফিরে আসা মুজাহিদদের কাছে সরাসরি সত্য কথা বলে নিজেদের ভুল স্বীকার করে নেন। এই তিনজন সাহাব হলেন হযরত কা‘ব বিন মালিক, যিনি মক্কায় ঐতিহাসিক বায়‘আতে আক্বাবায় অংশগ্রহণকারী ৭৩ জন পুরুষ সাহাবীর অন্যতম ছিলেন, হযরত মুরারাহ বিন রবী' এবং হযরত হেলাল বিন উমাইয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু য়ানহুম ওয়া আজমাঈন)। ইতিহাস এদেরকে পরিচয় দিয়েছে ‘আল-মুখাল্লাফূন’ (الْمُخَلَّفُوْنَ) বা ‘পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিগণ’ হিসেবে।

.

এরা তিনজনই ছিলেন অত্যন্ত মুখলেস এবং রাসূল ﷺ - এর সাথে বিভিন্ন জিহাদে অংশগ্রহণকারী সাহাবী। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁদের তাদের সরল স্বীকারোক্তিমূলক ওযর এবারের মত কবুল করলেন ঠিকই কিন্তু তাদেরকে সমাজ থেকে পূর্ণ বয়কটের নির্দেশ দিলেন। তাদের তিনজনকে একঘরে করে দিলেন। অতঃপর জিহাদে না যাওয়ার কারণে তাদের তাওবা কবুলের বিষয়টি সম্পূর্ণরুপে আল্লাহর উপর ন্যস্ত করে দিলেন।

.

চল্লিশ দিন অতিবাহিত হল আর তাদের তিনজনের অবস্থা কঠিন আকার ধারণ করতে লাগল। অবস্থা এতই বেগতিক যে, আপনজন, বন্ধুবান্ধব কেউই তাদের দিকে ফিরেও তাকাত না, কথাও বলত না, সালাম দিলে জবাবও দিত না। মুখ ফিরিয়ে চলে যেত। এক কথায় যাকে বলা হয় “একঘরে” করে দেওয়া।

.
এভাবে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত সমাজবিচ্যূত একাকীত্বের জীবন তাদের কাছে একঘেয়েমী লাগছিল। মনে হচ্ছিল এই বুঝি প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে যাবে। এমতাবস্থায় তাদের উপর এলো আরেকটি কঠিন পরীক্ষা। চল্লিশ দিনের মাথায় নির্দেশ এল যে তাদেরকে তাদের স্ত্রীদের থেকে আলাদা থাকতে হবে। সমাজ গেল, নাবী ﷺ - এর সুহবত গেল, এবার গেল ঘরের স্ত্রী’র সংস্পর্শ । যেই হুকুম সেই কাজ, তারা স্ব স্ব স্ত্রীদের পিতৃগৃহে পাঠিয়ে দিলেন। এতে অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠল। শুরু হল এক নতুন জীবন, নতুন পরীক্ষা, এক বিভীষিকাময় জীবনের গদ্যরচনা।

.

তারা তিনজন দিনে ও রাতে আল্লাহর দরবারে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাতেন। পরীক্ষা এখানেই শেষ নয়। ডাবল ডোজের এই বয়কট চলাকালীন সময়ে হযরত কা‘ব বিন মালিক (রাঃ) – সম্মুখীন হলেন আরেকটি কঠিন পরীক্ষার সামনে। গাসসান অধিপতি তাঁর নিকটে এক পত্র পাঠিয়ে তাদের তিনজনের প্রতি সহানুভূতি জানাল এবং কা‘বকে তাঁর দরবারে আমন্ত্রণ জানাল। পত্রে বলা হল যে, ‘আমরা জানতে পেরেছি, তোমাদের মনিব তোমাদের উপেক্ষা করেছেন। আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছনা ও অবমাননার জন্য জিইয়ে রাখেননি আর তিনি তোমার জীবন নষ্ট করতেও চান না। তুমি বরং আমাদের কাছে চলে এসো। আমরা তোমার প্রতি খেয়াল রাখব ও যথোপযুক্ত মর্যাদা দেব। চিঠি পড়েই কা‘ব (রাঃ) বলে উঠলেন “এটাও একটি পরীক্ষা’। তিনি (রাঃ) বলেন, "এরপর আমি পত্রটা একটা জ্বলন্ত চুলায় নিক্ষেপ করলাম’।

.

পঞ্চাশ দিনের মাথায় গাফুর আল্লাহ্‌ তাদের খালিস তাওবা কবুল করে নিলেন। তিনজনের উদ্দেশ্যে আয়াত নাযিল করে দিলেন -

وَعَلَى الثَّلاَثَةِ الَّذِيْنَ خُلِّفُوْا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوْا أَنْ لاَ مَلْجَأَ مِنَ اللهِ إِلاَّ إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوْبُوْا إِنَّ اللهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيْمُ-

‘এবং আল্লাহ দয়াশীল হন সেই তিন ব্যক্তির উপরে, যারা (জিহাদ থেকে) পিছনে ছিল। তাদের অবস্থা এমন হয়েছিল যে, প্রশস্ত যমীন তাদের উপরে সংকীর্ণ হয়ে পড়েছিল ও তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। তারা দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করেছিল যে, আল্লাহ ব্যতীত তাদের অন্য কোন আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর আল্লাহ তদের তাওবা কবুল করেন যাতে তারা ফিরে আসে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বাধিক তাওবা কবুলকারী ও অসীম দয়ালু’ (সূরা আত – তাওবাহ, আয়াতঃ ১১৮)।

.

তাওবা কবুলের উক্ত আয়াত নাযিলের সাথে সাথে মুমিনদের মধ্যে এক অদ্ভুত আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। সকলেই সাধ্যনুযায়ী যার যার মত দান- সাদাক্বা করতে লাগল। তাঁদেরকে দেখে মন হল এত আনন্দ তারা জীবনে আর কোনদিনই পায়নি। দিনটাই যেন তাদের জীবনের সবচেয়ে সৌভাগ্যময় দিন ছিল।

.
কা‘ব বিন মালিক (রাঃ) তখন তার বাড়ীর ছাদে নিঃসঙ্গ সময় পার করছিলেন। এমন সময় নিকটবর্তী সালা‘ (سَلْع) পাহাড়ের উপর থেকে একজন আহবানকারীর আওয়ায শোনা গেল- يَا كَعْبَ بْنَ مَالِكٍ أَبْشِرْ “হে কা‘ব বিন মালিক! সুসংবাদ গ্রহণ কর”।

.
কা‘ব (রাঃ) বলেন, এ সংবাদ শুনেই আমি সিজদায় পড়ে যাই। অতঃপর দৌড়ে রাসূল ﷺ - এর দরবারে চলে যাই। বন্ধু-বান্ধব চারদিক থেকে ছুটে এসে আমাকে অভিনন্দন জানাতে থাকে। সারা মদীনায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ হাস্যোজ্জ্বল মুখে আমাকে বলেন, أَبْشِرْ بِخَيْرِ يَوْمٍ مَرَّ عَلَيْكَ مُنْذُ وَلَدَتْكَ أُمُّكَ “সুসংবাদ গ্রহণ কর! জন্মের পর থেকে এমন আনন্দের দিন তোমার জীবনে আর কখনো আসেনি”।

আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল! এ (ক্ষমা) আপনার পক্ষ থেকে, না আল্লাহর পক্ষ থেকে?”
তিনি (সাঃ) বললেন, “আল্লাহর পক্ষ থেকে”
আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল! এর শুকরিয়া স্বরূপ আমি আমার সম্পদ থেকে আল্লাহর রাহে সাদাক্বা করতে চাই।
রাসূল ﷺ বললেন, “কিছু অংশ রেখে দাও। সেটা তোমার জন্য উত্তম হবে”।
আমি বললাম, “খায়বরের গণীমতের অংশ আমি রেখে দিয়েছি”।

.
অতঃপর কা’ব ইবনে মালিক (রাঃ) বললেন,
“সত্য কথা বলার জন্য আল্লাহ আমাকে নাজাত দিয়েছেন। অতএব আমার তাওবা এই যে, যতদিন বেঁচে থাকব কখনই সত্য ছাড়া বলবো না।

আল্লাহর কসম! রাসূল ﷺ - এর সামনে সত্য বলার আগ পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে সত্য কথা বলার জন্য আমার মত পরীক্ষা কাউকে দিতে হয়েছে বলে আমি জানতে পারিনি’।

তথ্যসূত্রঃ
বুখারী ও মুসলিমের বর্ণিত ঘটনা অবলম্বনে। এ বিষয়ে কা‘ব বিন মালেক (রাঃ) বর্ণিত বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে বুখারী হা/৪৪১৮; মুসলিম হা/২৭৬৯ -এ।
0