চিরকুট

চিরকুট


"চিরকুট" বইটির মূল্য

নতুন বইঃ 174 Taka


"চিরকুট" বইটির বিস্তারিত

হুমায়রা বলল, ‘তোমার কথা ঠিক আছে। তবে মেয়েরা এতো পড়াশুনা করে কী করবে, দিনশেষে তো হাড়িপাতিল নিয়েই জীবন পার করতে হবে।’

সুমাইয়া দীপ্তকণ্ঠে বলল, ‘ইসলাম এমন এক যুগে মানবসভ্যতার জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনীয়তার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছে, যখন পৃথিবীর সর্বত্র অজ্ঞতা, মুর্খতা এবং অন্ধকার বিরাজ করছিল। ইসলাম জ্ঞানার্জনকে কেবল বিশেষ শ্রেণীর অধিকার নির্ধারণ করেনি; বরং সকল মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক করেছে। জ্ঞান ব্যতীত নারী-পুরুষ সকলের ব্যক্তিত্বের পূর্ণতা অর্জন অসম্ভব। পুরুষের উপর যেভাবে জ্ঞানার্জন ফরয তদ্রূপ নারীর উপরও।

কেননা, ইসলাম চায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও জ্ঞান-বিবেক ও আত্মার উন্নতি সাধিত হোক। বর্তমান প্রেক্ষাপটের কথা একবার ভেবে দেখলেই বুঝা যাবে, একটা মেয়ের জন্য ধর্মীয় শিক্ষাগ্রহণ করা কতটা প্রয়োজন।

আইয়্যামে জাহেলিয়াতের মত নিকষকালো আঁধারে ছেয়ে গেছে পুরো পৃথিবী। নারী অধিকার নামে চলছে খুন-ধর্ষণ।
পশ্চিমা বিশ্ব নারী স্বাধীনতা ও নারী প্রগতির নামে নারীর নারীত্বকে হরণ করছে। নারীকে ভোগের উপকরণ ও ব্যবসায়ী পণ্যরূপে উপস্থাপন করেছে। তারা আজও নারীকে ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে, যেরূপ অজ্ঞতা ও বর্বরতার যুগে দেখা হতো।

এমন এক ক্রান্তিলগ্নে একটা মেয়ের জন্য নিরাপত্তা খুবই প্রয়োজন। দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া অত্যবশ্যক।’

হুমায়রা চিন্তিত হয়ে বলল, ‘তোমার কথা ফেলে দেওয়ার মতো নয়; বরং সঠিক কথাই বলেছো। কিন্তু বর্তামান সাধারণ মানুষের পাশাপাশি কিছু দ্বীনদার শ্রেণি মহিলা মাদরাসার বিরধীতা করে। আবার কিছু মানুষ পছন্দ করে, তবে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত পড়ানো একদমই পছন্দ করে না। তাদের অভিমত হলো, মেয়েরা বেশি পড়লে অহংকারী হয়, বড়দের সম্মান করতে ভুলে যায়। স্বামীকে সম্মান করে না, স্বামীর খেদমত করে না, শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করে না। তারা বলে, শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমতের কথা কি কু’রআন-হাদিসে আছে? বেশিরভাগ মহিলা মাদরাসার মেয়েদের অবস্থা এমন। আমাদের দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে যদি এরকম হয়, তাহলে স্কুল কলেজের মেয়েদের অবস্থা কেমন হবে!’

সুমাইয়া বলল, ‘তোমার কথাগুলো শুনে সত্যিই মর্মাহত আমি। আমাদের অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে আমজনতার অবস্থা কতটা করুণ হতে পারে! তবে একটি কথা কী জানো, মানুষ যতই মহিলা মাদরাসার বিরধীতা করুক না কেন, তবুও মহিলা মাদরসার গুরুত্ব অপরিসীম। ভালমন্দ সবখানে আছে। স্কুল কলেজে পড়াশোনা করে কেউ যদি শরিয়াতের বিধিবিধান অনুযায়ী চলে, পর্দা করে তবে এটা সবাই এক বাক্যে বলে মেয়েটার পরিবার দ্বীনদার, এজন্য সে শরিআত মোতাবেক চলে। খোঁজ নিলে বুঝা যাবে মেয়েটাকে কত লাঞ্চণার স্বীকার হতে হয়। বাঁকা চোখের চাহনি আর টিপ্পনী খেতে হয় নিত্যদিন। পক্ষান্তরে মহিলা মাদরাসার ছাত্রীদের এমন হয় না।

সবকিছুর বিরধীতা থাকবে, সমালোচনা থাকবে। কোনোকিছু সমালোচনার ঊর্ধে নয়। তাছাড়া মহিলা মাদরাসার মেয়েরাও মানুষ, ফেরেশতা নয়। মানুষ হিসেবে তারা ভুল করবেই।

হুমায়রা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘সাধারণ মানুষের উক্তি হলো, মাদরাসা পড়ুয়ারা তো সবকিছু জানে। জেনেশুনে ভুল করলে মানায়? হাদিস কু’রআন পড়ে তাহলে কী শিখলো? মাদরাসায় পড়ে মানুষ না হয়ে অমানুষ হয়েছে। এদের না পড়িয়ে বাসায় বসিয়ে রাখা উচিত। বিশ্বাস করো সুমাইয়া, যখন এরকম কথা শুনি, তখন হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। দু'চোখ ছলছল করে ওঠে। সবসময় ভাবি, কেন মাদরাসা পড়ুয়াদের এতো বদনাম! এই বদনাম থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় কী! ভাবি, প্রতিটাক্ষণ ভাবি। ভাবনার অতল গভীরে হারিয়ে যাই কিন্তু সমাধানের পথ খুঁজে পাই না।’

সুমাইয়া বলল, ‘দেখো, আমরা যদি মাদরাসা পড়ুয়াদের সমালোচনা করি, বিরধীতা করি, ঘৃণা করি তাহলে মাদরাসার শত্রু বাড়তে থাকবে। কিন্তু সমাধান হবে না। এই যে এতো এতো সমালোচনা হচ্ছে, কই মাদরাসা তো বন্ধ হয়ে যায়নি! দাওরায়ে হাদিস পড়ালে মেয়েরা অহংকারী হয়ে যায়, বড়দের সম্মান করে না। কিন্তু কোনো মাদরাসা থেকে কি 'তাকমিল’ জামাতটা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে?! কোনোকিছু থেমে যাইনি, ইনশাআল্লাহ থেমে যাবে না। আল্লাহ চাহে তো কেয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে। এখন আমাদের উচিত হলো, সমালোচনা না করে সমাধানের পথ বের করা।

তাছাড়া একটা মেয়েকে নুরানী থেকে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত শেষ করতে দশ বছর লাগে। তখন তার বয়স হয় ষোল কিংবা সতেরো। এতো ছোট একটা মেয়ে দাওরায়ে হাদিস শেষ করে ঠিকই, কিন্তু তার মধ্যে গাম্ভীর্যতা আসে না। কিছুটা ছুটাছুটি আর তিড়িংতিড়িং করাটা স্বাভাবিক। আক্ষরিক জ্ঞান আর বয়সের ভার-বুদ্ধি এক নয়। কু’রআন-হাদিস পড়ে, হাদ্দাসানার সুর লহরী রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যায় কিন্তু বুঝের স্বল্পতার কারণে এবং অল্প বয়সের কারণে অনেকসময় সে সঠিক-বেঠিক বিবেচনা করতে পারে না। বয়সের সাথেসাথে তার আখলাকের পরিবর্তন ঘটতে থাকে।

একটা মেয়ে প্রাথমিক শিক্ষা পায় তার পরিবার থেকে। যার পরিবার যেমন সে ঠিক তেমনই গড়ে ওঠে। পারিবারিক শিক্ষাই বড় শিক্ষা। এমনও অনেক মেয়ে আছে, স্কুলে এসএসসি পড়ে। মেয়ের উল্টাপাল্টা চলাফেরার কারণে মাদ্রাসায় এনে ভর্তি করিয়ে দেয় যেন একটু ভালো হয়ে থাকে। আবার এমনও অনেক মেয়ে আছে, মাস্টার্স শেষ করে বাড়িতে বসে আছে। বয়স বেড়ে যাওয়ায় বিয়ের বাজারে চাহিদা হারিয়ে ফেলেছে। এরপর গার্ডিয়ান তাড়াতাড়ি তাকে মাদরাসায় নাজেরাখানায় ভর্তি করিয়ে দেয় যেন একজন দ্বীনদার ছেলে তাকে বিয়ে করে। আবার এমনও মেয়ে আছে, বাড়িতে বেপর্দাভাবে চলাফেরা করে আর মাদরাসায় এসে সুফি সাজে। আচ্ছা এই মেয়েগুলোর উল্টাপাল্টা করার ব্যাপারে কি এই প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই দায়ী? নাকি তার পরিবার ও সমাজেরও কোনো দায়বদ্ধতা আছে?’

‘অবশ্যই পরিবার এবং সমাজও এখানে দায়বদ্ধ।’

সুমাইয়া আবার বলতে লাগলো, ‘তবে এটা ঠিক যে, আজকাল এমন কিছু মেয়ের জন্য এবং কিছু কিছু মাদ্রাসার ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনার জন্য সামগ্রিক বদনাম হচ্ছে। এখন প্রয়োজন হলো সেসব মাদ্রাসাগুলোর এবং ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিগুলোর পরিমার্জন করা। মেয়েদের আবাসিক থাকার ব্যাপারে শরিয়তের বিধানকে শতভাগ আমলে নিয়ে আসা। পাশাপাশি পরিবার থেকেই মেয়েদের দ্বীন শিক্ষার সর্বোচ্চ সুযোগ তৈরির চেষ্টা করা। পরিবারে দ্বীন শেখার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না করেই এই প্রক্রিয়াটিকে প্রশ্নের সম্মুখীন করলে নারীদের নৈতিক, চারিত্রিক ও শিক্ষার দিকটাতে ব্যাপকভাবে ধস নামবে।

কাজেই মাথা ব্যথা হলে মাথা কেটে না ফেলে তার চিকিৎসা করানো চাই। অসঙ্গতিগুলো এবং এর ক্রিড়ানকদেরকে চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া চাই। নারী শিক্ষাখাতে সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবি এটা। আর না হয় এভাবে আর কিছুদিন চলতে থাকলে নারীদের এই শিক্ষাখাতটি ফিতনার স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে। তখন বাধ্য হয়ে স্কুল-কলেজের অগ্নিকুণ্ডে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় ঝলসে যাবে আমাদের মেয়েগুলো। মুখথুবড়ে পড়বে মুসলিম নারী সমাজ। বন্ধ হয়ে যাবে নারীদের দ্বীন চর্চার এই সুবিশাল প্লাটফর্ম।

আর একটি কথা হলো, দাওরায়ে হাদিস পড়লেই মেয়েরা অহংকারী হয়, এটা একটা ভুল ধারণা। ছেলেরা কি অহংকারী হয় না? আমি তো দেখছি কেউ কারো চেয়ে কম না। অনেক ছেলেরাও অহংকার বসত একে অপরকে যাচ্ছেতাই বলে। মেয়েদেরকেও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। অথচ অনেক বড় বড় সাহাবিও আম্মাজান আয়িশা রা. এর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছেন। ইতিহাসের মুসলিম নারীদের কৃতিত্বকে তারা কীভাবে দেখে আমার জানতে ইচ্ছে হয়। আর বর্তমান নারীদের অবদান ও অবস্থানকে তারা কোন লেভেলে দেখতে চায় সেটাও জানতে ইচ্ছে হয়। তবে কিছু ব্যতিক্রমী তো থাকবেই, তাই বলে ঢালাওভাবে বদনাম করা সুস্থ বিবেকের কাজ না।

সেক্যুলার সমাজ এমনিই নারীশিক্ষা নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা করে ফেলছে, এর উপর মুসলিম নারীদের এই মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা যদি হুমকির মুখে পড়ে তাহলে এটাকে মুসলিম নারী সমাজের জন্য বড় অশনিসংকেত মনে করি।

‘নেপোলিয়ন’ বলেছিল- আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে একটি শিক্ষিত জাতি দেব।

এর সাথে আমি একটু আগ-বাড়িয়ে বলব, আমাকে একটি দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে একটি সুশিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’
0