আরজ আলীর রম্য

আরজ আলীর রম্য's Category :

আরজ আলীর রম্য's Publication :

আরজ আলীর রম্য's Writer :

আরজ আলীর রম্য


"আরজ আলীর রম্য" বইটির মূল্য

নতুন বইঃ 132 Taka


"আরজ আলীর রম্য" বইটির বিস্তারিত

Pages 56

কলা বিজ্ঞান

--------------------------

আরজ আলী নিজেকে বিজ্ঞান মনষ্ক বলিয়া দাবি করেন। বিজ্ঞানের বাইরের সবকিছুকেই তিনি অযৌক্তিক বলিয়া মনে করেন। এই যেমন, আল্লাহর উপর ভরসা করা, ক্ষেতের ফলন ভালো হইবার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করা, বিপদে পরিলে দোয়া ইউনুস পড়া। এসব কিছুকেই তিনি অহেতুক কর্ম বলিয়া মনে করেন।

তিনি চান তাহার প্রতিবেশী আলেফ মিয়াও যেনো তাহার মতোই বিজ্ঞান মনষ্ক হয়। এই লক্ষ্যে তিনি আলেফ মিয়াকে তাহারি মতো বিজ্ঞান বিষায়ক পুস্তক পড়িতে উদ্ভুদ্ধ করেন, সেই সাথে কুসংস্কারের বিপরীতে বিজ্ঞানের যৌক্তিকতা বিষায়ক তালিম প্রদান করেন।

এতো কিছুর পরও আলেফ মিয়া বিজ্ঞান মনষ্ক হইয়া উঠিতে পারিতেছেন না। এজন্য আরজ আলীর আফসোসের অন্ত নাই। এইতো সেইদিন আলেফ মিয়া সয়ং আরজ আলীকেই বলিয়া ফেলিলে "মিয়াভাই, দোয়া করিবেন এবারের ফসল যেনো ভালো হয়।"

এই কথায় আরজ আলী বড্ড খেপিয়া গেলেন। পরক্ষণেই ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করিয়া তামাসা করিয়া বলিলেন "আশির্বাদ করিতেছি, বিজ্ঞান আপনার মঙ্গল করুক।"

তামাসাটা আলেফ মিয়া বুঝিতে পারিলেন। ইহাও বুঝিতে পারিলেন যে আরজ আলীর সহিত ধর্মীয় বিষয়ে কথা বলাটা তিনি পছন্দ করেননা।

দুইদিন পরঃ

নয়াবাড়ির হটে আলেফ মিয়া। তাহার পাঁচ বৎসর বয়সের কন্যাসন্তানের জন্য একটি আরবি কয়দা, একটি "একের ভিতরে পাঁচ" নামক বাংলা বই এবং একটি "থ্রি ইন ওয়ান" নামক ইংরেজি বই খরিদ করিয়াছেন। বইয়ের মূল্য পরিশোধ করিতে-না-করিতেই বইয়ের দোকানের সামনে আসিয়া দাড়াইলেন আরজ আলী। হাসি মুখে বলিলেন "বাচ্চার জন্য বই কিনিতেছেন মনে হইতেছে? তা কি বই কিনিলেন?"

আলেফ মিয়া তাহার ক্রয়কৃত বই গুলো আরজ আলীর হাতে দিলেন। আরজ আলী এপিঠ ওপিঠ করিয়া দেখিয়া বলিলেন "আরবি কায়দা কিনিয়া অহেতুক পয়সা অপচয় করিতেছেন কেনো? ইহা পড়িয়া আপনার বাচ্চা কি শিখিতে পারিবে? শিখিবে তো সব অবৈজ্ঞানিক কথাবার্তা। বেহেস্ত, দোজখ, ফেরেশতা, আল্লাহ্ এইসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছেনাকি?"

আলেফ মিয়া বলিলেন "মিয়াভাই, তাহা হইলে তো বাংলা ইংরেজিও পড়ানো যাইবে না।"

আরজ আলি বিরক্ত হইয়া বলিলেন "কেনো? বাংলা ইংরেজী পড়িতে না করিতেছে কে?"

আলেফ মিয়া হাসিতে হাসিতে বলিলেন "এই বাংলা বইয়ে দেখেন হাট্টিমা টিম টিম নামক প্রাণীর কথা বলা হইয়াছে, ইহাও তো অবৈজ্ঞানিক। আবার আরেকটা ছড়ায় আছে খোকার সাথে শশুর বাড়ি যাইবে বলিয়া হুলো বিড়াল কোমড় বাধিয়াছে। আচ্ছা মিয়াভাই হুলো বিড়াল কোমড় বাধে, ইহা কি বৈজ্ঞানিক? এবার ইংরেজি বইএ আসেন, হামটি ডামটি নামক এক অদ্ভুত প্রাণীর কথা বলা হইয়াছে, এমন কোনো প্রাণী কি বিজ্ঞান খুজিয়া পাইয়াছে? আবার অন্য এক ছড়ায় দেখিলাম এক বালক একটি ভেড়ার কাছে জিজ্ঞেস করিতেছে তাহার নিকট উল আছে কিনা, ভেড়াটা জবাবে বলিতেছে তিন ব্যাগ উল আছে। আচ্ছা মিয়াভাই, ভেড়ে যে জবাব দিলো ইহা কি বিজ্ঞান সম্মত?"

আলেফ মিয়ার কথা শুনিয়া আরজ আলী বলিলেন "আপনি মিয়া বেশি বুঝেন।"

এই বলিয়া আলেফ মিয়ার পুস্তক গুলো আলেফ মিয়ার হাতে ধরাইয়া দিয়া আরজ আলি চলিয়া যাইতে লাগিলেন। তখন আলেফ মিয়া ডাকিয়া বলিলেন "মিয়াভাই, তাহা হইলে বাচ্চার জন্য কোন বই কিনিবো?"

আরজ আলী রাগিয়া বলিলেন "আপনার যাহা মনে চায় তাহাই কিনেন।"

আলেফ মিয়ার সহিত আরজ আলীর আবার দেখা হইয়াছিলো হাট হইতে ফিরিবার পথে নদীর ঘাটে। আলেফ মিয়া যেই নায়ে উঠিয়াছে আরজ আলোও সেই নায়ে উঠিয়াছে নদী পার হইতে।

আরজ আলী আলেফ মিয়াকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিলেন "আপনি তাহা হইলে তিনটা বই ই কিনিয়াছেন।"

জবাবে আলেফ মিয়া কেবল এক গাল হাসি প্রদর্শন করিলেন।

সন্ধ্যা হইয়া আসিতেছিলো। নাও যখন মাঝ নদীতে তখন আকাশ কালো হইয়া তুফান উঠিয়া আসিলো। সকলে ভয়ে চিৎকার করা শুরু করিলো। আলেফ মিয়া বলিলেন "চিৎকার না করিয়া সকলে দোয়া ইউনুস পড়েন।"

কপাল ভালো ছিলো বলিয়ে কোনোরূপ বিপত্তি ঘটেনাই। কয়েক দফা দমকা বাতাস প্রবাহিত হইবার পরে আকাশ পরিষ্কার হইয়া যায়, বাতাসও থামিয়া যায়।

নাও হয়তে নামিয়া আরজ আলী এবং আলেফ মিয়া একি সাথে বাড়ির পথে পা বাড়াইলেন। পথিমধ্যে আরজ আলী বলিলেন "আপনি কি ভাবিয়াছেন আপনাদের ওই দোয়া ইউনুস পড়িবার কারনে তুফান থামিয়া গিয়াছে?"

আলেফ মিয়া বলিলেন "জী মিয়াভাই।"

আরজ আলী হাসিয়া বলিলে "এমন অবৈজ্ঞানিক চিন্তা আপনারা করেন কেমন করিয়া? আরে মিয়া, আপনারা দোয়া না পড়িলেও তুফান থামিয়া যাইতো। সবকিছুকে একটু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে দেখিবার চেষ্টা করেন।"

আলেফ মিয়া হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াইলেন।

দুইদিন পরঃ

ভোরবেলা আরজ আলী আসিয়া আলেফ মিয়াকে ডাকিতে লাগিলেন। হাঁকডাক শুনিয়া আলেফ মিয়া বাহির হইলেন। আরজ আলী বলিলেন "মিয়া আপনি কি ভুলিয়া গিয়াছেন যে আজিকে পহেলা বৈশাখ, নববর্ষ। জলদি আসেন, কলেজ মাঠে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হইতেছে।"

আলেফ মিয়া বলিলেন "মিয়াভাই, আমি না গেলে হয় না?"

আরজ আলী কোনো কথা শুনিলেন না, আলেফ মিয়াকে ধরিয়া লইয়া গেলেন কলেজ মাঠে।

মাঠে অনেক ছাত্রছাত্রীর সমাগম। প্রথমে বৈশাখকে আমন্ত্রণ জানাইয়া গান শুরু হইলো "এসো হে বৈশাখ, এসো এসো।" যখন এই গানে উপস্থিত সকলে শিল্পীদের সুরে গুনগুন করিয়া সুর মিলাইতেছে তখন আলেফ মিয়া বলিলেন "ইহা কি বিজ্ঞান সম্মত?"

আরজ আলী বলীলেন "কোনটা?"

আলেফ মিয়া বলিলেন "এইযে বৈশাখকে আমন্ত্রণ জানানো হইতেছে। বৈশাখে তো একটা সময় মাত্র। সময়ের কি কান আছে যে এই গান শুনিবে?"

আরজ আলী বিরক্ত হইয়ি বলিলেন "আরে মিয়া, ইহা হইলো সংস্কৃতি।"

আলেফ মিয়া আবার বলিলেন "মিয়াভাই, বিজ্ঞান কি বলিয়াছে যে বৈশাখকে গানে গানে আমন্ত্রণ জানাইলে বৈশাখ আসিবা নাহা হইলে আসিবে না?"

আরজ আলী এবার একটু ধমক দিয়া বলিলেন "ইহার মধ্যে বিজ্ঞান টানিয়া আনিতেছেন কেনো?"

আলেফ মিয়ার মনে আরো কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খাইতেছিলো, কিন্তু আরজ আলীর অগ্নিমূর্তি দেখিয়া আর মুখ খুলিলেন না।"

গানে গানে বৈশাখকে বরন করা হইলো। আলেফ মিয়ার খুব ইচ্ছা করিলো বৈশাখকে জিজ্ঞেস করিতে যে এই বরণে বৈশাখ খুশি হইলো নাকি হইলো।

সূর্য খানিকটা উপরে উঠিতেই শুরু হইলো আরেক হুলুস্থুল কান্ড। সকলে দেও-দানব, রক্ষস-খোক্কোস, হুতুম পেচার মুখস লইয়া রাস্তায় নামিয়া আসিলো। আলেফ মিয়া জিজ্ঞেস করিলেন "ইহা কি হইতেছে ?"

আরজ আলী অতি উৎসাহের সহিত বলিলেন "ইহাকে বলে মঙ্গল শোভাযাত্রা, সমজ হইতে সকল অমঙ্গল দূর করার উদ্দেশ্যে এই শোভাযাত্রা কর হয়।"

আলেফ মিয়া বলিলেন "যেইসব ভূত-প্রেত লইয়া যাত্রা করা হইতেছে তাতে তো মনে হইতেছে ইহা অমঙ্গল শোভাযাত্রা।"

এই কথা শুনিয়া আরজ আলী বড্ড রাগিয়া গেলেন। "আপনাকে এইখানে আনাই আমার ভুল হইয়াছে" বলিয়া আলেফ মিয়াকে চুপ থাকিতে বলিলেন।

আলেফ মিয়া চুপ থাকিতে পারিলেন না। আবারো প্রশ্ন করিলেন "মিয়াভাই, বিজ্ঞান কি বিলিয়াছে যে এইসব রক্ষস-খোক্কোস, হুতুম পেচার মুখস লইয়া শোভাযাত্রা করিলে সমাজ হইতে অমঙ্গল দূর হইবে?"

এবার আরজ আলী ক্ষেপিয়া গিয়া বলিলেন "আপনি মিয়া বেশি বুঝেন, আপনার মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করিতে হইবে না, যান বাড়ি চলিয়া যান।" এই বলিয়া আলেফ মিয়াকে মঙ্গল শোভাযাত্রা হইতে বাহির করিয়া দিলেন আরজ আলী।

মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করিতা না পারিয়া কলা বিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী নিজের উপর অমঙ্গল ডাকিয়া আনিলেন আলেফ মিয়া। না জানি কোন অমঙ্গল আসিয়া তাহাকে ঘিরিয়া ধরে এই আসংঙ্কা লইয়া বাড়ি ফিরিলেন।

গ্রন্থঃ আরজ আলির রম্য
0